ব্রাজিলে ভোটের আগের রাতে লুলা ও বলসোনারোর শক্তির মহড়া, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা ভোটের আগের শেষ দিনে হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে শক্তির মহড়া দিয়েছেন দুই প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ফ্লাভিও বলসোনারো। রোববারের এই রান-অফ ভোটেই ঠিক হবে ব্রাজিলীয়রা তাদের বামপন্থি নেতার সঙ্গেই থাকবেন, নাকি ডানদিকে ঝুঁকবেন।
লাল টুপি পরে রিও দে জেনেইরোর কোপাকাবানা সৈকতে শত শত সমর্থকের সামনে ভাষণ দেন লুলা। প্রচারণার ট্রাক থেকে ব্রাজিলের পতাকা নাড়িয়ে তিনি জনতার উদ্দেশে বলেন, জনগণকে বেছে নিতে হবে—এমন কাউকে যে জাতীয় পতাকাকে চুম্বন করে, নাকি এমন কাউকে যে আমেরিকার পতাকাকে চুম্বন করে। এই মন্তব্যে তিনি প্রতিপক্ষের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
৮০ বছর বয়সী লুলা রোববারের রান-অফে চতুর্থ, তবে টানা নয়, এমন মেয়াদের জন্য লড়ছেন। ভোটারদের সামনে প্রশ্ন একটাই—তারা বর্তমান বামপন্থি নেতার ওপর আস্থা রাখবেন, নাকি অঞ্চলজুড়ে ডানদিকে ঝোঁকার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেই পথে হাঁটবেন।
প্রথম দফার ভোটে সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলেন ৪৭ শতাংশ ভোট, আর লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ। ফ্লাভিও সাবেক কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতেও দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রায় সমান সমান লড়াইয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। শনিবার প্রকাশিত সিএনটি/এমডিএ জরিপে বলা হয়েছে, বলসোনারো পেতে পারেন ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট, আর লুলা ৪৫ শতাংশ। গত সপ্তাহে একই জরিপে ব্যবধান ছিল আরও কম—বলসোনারো ৪৬ দশমিক ৮, লুলা ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এই জরিপের ভুলের মাত্রা ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
আরেকটি হিসেবে, দাতাফোলা জরিপে দুই প্রার্থীই ৫০ শতাংশ করে সমর্থনে আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন জরিপে ভিন্ন চিত্র এলেও সবগুলোর বার্তা এক—ফল কোন দিকে যাবে, তা আগাম বলা প্রায় অসম্ভব।
শনিবার বলসোনারোর সমর্থকেরা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিনাস জেরাইসে জড়ো হন। তাদের মধ্যে ছিলেন শত শত মোটরসাইকেল আরোহী, যাদের অনেকের গায়ে ছিল ব্রাজিলের হলুদ জাতীয় ফুটবল জার্সি।
বলসোনারোর এক সমর্থক এবের্ত দোরিগো সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) সরকারি কল্যাণের ওপর নির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে বলে তিনি মনে করেন, আর দেশের জন্য দিক বদল দরকার। তার ভাষায়, তাদের মূল্যবোধ হলো জাতি ও পরিবার, আর কঠোর পরিশ্রম ছাড়া উন্নতি আসে না—এই বোধটাই কল্যাণনির্ভর নীতির কারণে অনেকের মধ্যে তৈরি হয়নি।
তিক্ত এই প্রচারণা অর্থনৈতিক নীতি, অপরাধ ও ব্রাজিলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর বিভাজন সামনে এনেছে। বলসোনারো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে কারাগারে আরও কয়েক লাখ আসন বাড়াবেন এবং সরকারি ব্যয় কমাবেন।
ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারো ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে তিনি এখন ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
শুক্রবার শেষ বিতর্কে দুই প্রার্থী তুলনামূলক শান্ত সুরে কথা বললেও দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা ও পরস্পরের রেকর্ড নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন। বিতর্কের সেই শান্ত সুরের পর শনিবারের জনসভাগুলোতে আবার ফিরে আসে প্রচারণার উত্তাপ।
কিছু ভোটারের জন্য পছন্দটা সহজ নয়। ইভেন্ট আয়োজক গাব্রিয়েলা রিবেইরো ভিয়ানা এএফপিকে বলেন, অন্য কোনো প্রার্থী থাকলে সেটাই ভালো হতো; কিন্তু এখন তাদের বেছে নিতে হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ, ভয়ংকর ও কম মন্দের মধ্যে থেকে।
রোববার ভোটগ্রহণ শেষে ফল আসতে শুরু করলেই বোঝা যাবে ব্রাজিল কোন পথ বেছে নিল। আপাতত দুই শিবিরই শেষ মুহূর্তের জনসমর্থনকে ভোটে রূপ দেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত, আর পুরো দেশ তাকিয়ে আছে একটি অনিশ্চিত ও ঘনিষ্ঠ ফলের দিকে।





