যখন তওবা করলেও ক্ষমা মিলবে না: মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত ও পশ্চিমে সূর্য ওঠার পর বন্ধ হয়ে যায় দরজা
মানুষ যত বড় পাপই করুক না কেন, আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেন — কোরআন ও হাদিসে বারবার আল্লাহর ক্ষমার বিশালত্বের কথা বলা হয়েছে। তবে এমন কিছু নির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে, যখন ক্ষমার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথম পরিস্থিতিটি হলো মৃত্যুর একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া। মানুষের প্রাণ যখন কণ্ঠনালিতে চলে আসে এবং সে পরকালের অদৃশ্য জগৎ স্বচক্ষে দেখতে পায়, তখনকার তওবা আল্লাহ গ্রহণ করেন না বলে এই আলোচনায় বলা হয়েছে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের জন্য কোনো তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তওবা করছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৮)
মহানবী (সা.) বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয় বা প্রাণবায়ু কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৩৭)
উদাহরণ হিসেবে ফেরাউনের কথা এসেছে। লোহিত সাগরে ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে সে ইমান আনার কথা বলেছিল; কিন্তু আল্লাহ সেই তওবা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
দ্বিতীয় বড় সীমারেখা হলো কেয়ামতের অন্যতম বড় নিদর্শন — পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠা। যেদিন এই ঘটনা ঘটবে, সেদিন পৃথিবীর সব মানুষের জন্য তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন তোমার রবের কোনো নিদর্শন এসে পড়বে, সেদিন কোনো ব্যক্তির ইমান তার কাজে আসবে না, যদি সে আগে ইমান না এনে থাকে অথবা তার ইমানের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন না করে থাকে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৮)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৩)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো মানুষের হক বা অধিকার। আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত পাপ — যেমন নামাজ না পড়া বা রোজা না রাখা — আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন; কিন্তু কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করলে বা কাউকে কষ্ট দিলে, ওই ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা ক্ষমা করেন না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে বা কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয়...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯) ইমাম নববির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার পাপ শুধু আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলেই মাফ হয় না; পাওনাদারের অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া অথবা তার কাছ থেকে স্পষ্টভাবে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া তওবা কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত।
সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শিরক — আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। জীবিত থাকা অবস্থায় শিরক থেকে খাঁটি তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন, কিন্তু কেউ শিরক বা কুফরের ওপর অটল থেকে মারা গেলে পরকালে তার জন্য ক্ষমার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
এই আলোচনার মূল বার্তা হলো, তওবা মানে শুধু মৌখিক শব্দ উচ্চারণ নয়; এটি পাপের জগৎ থেকে পুরোপুরি ফিরে আসার এক ঐকান্তিক সিদ্ধান্ত। মৃত্যু বা কেয়ামতের ভয়াবহতা চোখের সামনে দৃশ্যমান হওয়ার আগেই, সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ক্ষমা চাওয়াই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য — কারণ সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর অনুশোচনা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।



