রাশিয়ার যুদ্ধের ছায়ায় বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট, এগিয়ে ইওতোভা
রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ কৃষ্ণসাগর উপকূলের জলে ছড়িয়ে পড়ার আবহে বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ চলছে। দেশটির উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার ঘটনা এই নির্বাচনকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোববারের ভোটের আগে জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইওতোভা, বয়স ৬১, এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে গিউরভ, বয়স ৫০। মোট ২৭ জন প্রার্থী এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে মূল লড়াই এই দুজনের মধ্যেই হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদ মূলত আনুষ্ঠানিক। বড় নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সংসদের অনুমোদন নিয়েই নিতে হয়। তবু সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বেশি। প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, তিনি আইনে ভেটো দিতে পারেন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করতে পারেন এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে পারেন।
নির্বাচনটি বাড়তি মনোযোগ পাচ্ছে বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক ড্রোন হামলার কারণে। এসব হামলায় সম্ভবত প্রায় দুই ডজন আন্তর্জাতিক নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলাগুলো আন্তর্জাতিক নিন্দা কুড়িয়েছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরিধি বাড়তে থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যার পর বুলগেরিয়া তার সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে মিত্রদের সহায়তা চেয়েছে।
বুলগেরিয়া সরকার এই হামলার জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করা থেকে বিরত থেকেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ বলেছেন, এসব হামলার ফলাফল রাশিয়ান ফেডারেশনেরই সুবিধা বয়ে আনছে।
শীর্ষ দুই প্রার্থীই হামলাগুলোর নিন্দা করেছেন, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের অবস্থান আলাদা। গিউরভ এ বছর তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি পশ্চিমাপন্থী সংস্কারবাদী দলগুলোর সমর্থন পাচ্ছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি কিয়েভের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তিতেও সই করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার এক সমাবেশে গিউরভ বলেন, তিনি চান বুলগেরিয়ার নিজের একটি কণ্ঠস্বর থাকুক ইউরোপে — প্রস্তুতি, শক্তিশালী কূটনীতি ও স্পষ্ট অবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা একটি নির্ভরযোগ্য ন্যাটো মিত্র হিসেবে দেশকে দেখতে চান তিনি।
অন্যদিকে ইওতোভা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। রাদেভ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পদত্যাগ করলে গত জানুয়ারিতে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। রাদেভ সেই নির্বাচনে জয়ী হন, যাকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রেমলিনবান্ধব বলে মনে করেন। রাদেভ ইওতোভাকে সমর্থন করছেন, এবং তাঁরা দুজনেই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাপ্তির আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার এক সমাবেশে ইওতোভা বলেন, তাঁর প্রতিপক্ষরা মনে করেন ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধই চলতে হবে। কিন্তু সত্য হলো, সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত আমরাই — এই মন্তব্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়।
মার্কেট লিংকস ভোট গবেষণা সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দোব্রোমির ঝিভকভের মতে, ইওতোভা তাদেরই একজন, যারা বুলগেরিয়ার আরও নিরপেক্ষ অবস্থানের পক্ষে। তাঁরা ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করা ও অস্ত্র সরবরাহ থামানোর কথা বলেন এবং প্রায়ই ক্রেমলিনের বক্তব্য ও প্রচারণা থেকে সরাসরি নেওয়া পরিভাষা ব্যবহার করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদের দলগুলোর মধ্যে দেশের পশ্চিমা পথ নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাপক রুশপন্থী আবেগ সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে, বিশেষ করে মস্কোর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে। প্রার্থীরা জ্বালানির দামের তীব্র ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে জনভীতিকেও ভাষা দিচ্ছেন, যেখানে গ্রামাঞ্চলের অনেক বুলগেরীয় জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আলফা রিসার্চের জরিপে ইওতোভা পাচ্ছেন ৪১ শতাংশ ভোটের সমর্থন, আর গিউরভ পাচ্ছেন ২৮ শতাংশ। ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে সকাল সাতটায় এবং শেষ হবে রাত আটটায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২৭ প্রার্থীর কেউই প্রথম পর্বে সরাসরি জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন না।
জয়ের আরেকটি শর্ত ভোটার উপস্থিতি — ৬৬ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়তে হবে, অথচ রোববারের উপস্থিতি ৪০ শতাংশের কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ১ নভেম্বর দ্বিতীয় পর্বের ভোটের সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি।




