পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর মরদেহ দেখার পরই বদলে যান জামালগঞ্জের এসিল্যান্ড: স্ত্রীর ভাষ্যে নতুন তথ্য, চিকিৎসাধীন ঢাকায়
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এক শিশুর মরদেহ দেখার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন আসে বলে জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী সাদিয়া মৌ সূচনা। এরপর থেকেই তাঁর আচরণ অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। নতুন এই ভাষ্যে ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে এক আনসার সদস্যের সঙ্গে এসিল্যান্ডের অপ্রীতিকর ঘটনা ও নিজের সরকারি ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া একটি পোস্ট ঘিরে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ঘটনাটি নিয়ে তখন থেকেই স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছিল।
বর্তমানে আরিফুর রহমান শান্ত ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শ্বশুর মহসিন মিয়া জানিয়েছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা এখন ভালো। তাঁর স্ত্রীও হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। পরিবারের এই তথ্যে আপাতত স্বস্তির খবর মিলেছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই মাস আগে জামালগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন আরিফুর রহমান শান্ত। তাঁর স্ত্রীর ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) উপজেলার বেহেলী এলাকায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এক শিশুর মরদেহ দেখার পরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি এবং তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে তাঁর আচরণ আরও অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। এ সময় দায়িত্বরত দুই আনসার সদস্যের সঙ্গে তিনি মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি এক আনসার সদস্যকে মারধর ও তাঁর মুঠোফোন ভেঙে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
একই রাতে আরিফুর রহমান শান্তের সরকারি ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এতে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক দায়ী থাকবেন।’ পোস্টটি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানান। একই সঙ্গে ইউএনওর ফেসবুক আইডি থেকে জানানো হয়, এসিল্যান্ডের ব্যবহৃত মুঠোফোন হ্যাক করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউএনও জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বন্দে আলী মিয়া, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন এবং ভূমি কার্যালয়ের নাজির সাব্বির আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে এসিল্যান্ডের সরকারি বাসভবনে যান। সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সেখানে এসিল্যান্ডের স্ত্রী অন্যদের ভেতরে প্রবেশ করতে না দিয়ে চিকিৎসককে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। চিকিৎসক আব্দুল বাতেন ভেতরে গেলে এসিল্যান্ডের স্ত্রী তাঁকে ‘হেলোসিন’ ও ‘পারকিনিল’ নামের দুটি ইনজেকশন জামালগঞ্জে পাওয়া যাবে কি না, তা জানতে চান। স্থানীয় কোনো ফার্মেসিতে ইনজেকশন দুটি না পাওয়ায় চিকিৎসক সঙ্গে থাকা বিকল্প ইনজেকশন প্রয়োগ করেন। তবে তাতে কাজ না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিলেটে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন বলেন, এসিল্যান্ডের স্ত্রী নির্দিষ্ট দুটি ইনজেকশনের কথা বললেও স্থানীয়ভাবে সেগুলো না পাওয়ায় ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো প্রভাব না পড়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানোর পরামর্শ দিই। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি চরম মানসিক চাপে ভুগছিলেন।
জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী মিয়া বলেন, এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, এর আগেও দুয়েকবার এমন উল্টাপাল্টা আচরণ এসিল্যান্ড করেছেন। তাঁকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। পুলিশের এই বক্তব্যে বোঝা যায়, এমন আচরণ তাঁর ক্ষেত্রে একেবারে নতুন ছিল না।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক বলেন, এসিল্যান্ড দুই মাস হয় যোগদান করেছেন। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ, এটি আমি এর মধ্যে জেনেছি। কিন্তু তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ, এটা শুক্রবারই জানা হয়েছে আমার। ইউএনও আরও বলেন, শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এসিল্যান্ড একজন আনসার সদস্যকে মেরেছেন। ছোট বাচ্চাদের মারতে দৌড়ে গেছেন। এসিল্যান্ডের স্ত্রী বলেছেন, বৃহস্পতিবার বেহেলীতে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর মরদেহ দেখে এমন আচরণ করতে থাকেন তিনি।
এসিল্যান্ডের শ্বশুর মহসিন মিয়া বলেন, শান্ত ঢাকার পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমার মেয়ে তাঁর সঙ্গে আছে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর মরদেহ দেখেই শান্ত মানসিকভাবে অসুস্থ হয়েছেন। এখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে সেই শিশুর মরদেহ দেখার বিষয়টিই বারবার উঠে এসেছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, শুক্রবার অনেক রাতে জামালগঞ্জের ইউএনও বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছেন। ইউএনওর সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ ছিল না। তিনি মানসিকভাবে আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। পানিতে পড়া এক শিশুর মরদেহ দেখে অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। এখন তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন, এসিল্যান্ড সুস্থ আছেন। জেলা প্রশাসনের এই বক্তব্যে ইউএনওর সঙ্গে বিরোধের গুজবও খণ্ডন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এখন যে চিত্রটি দাঁড়িয়েছে, তা হলো—একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর দৃশ্য একজন তরুণ কর্মকর্তার মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, যার পরের ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয় প্রশাসনকে রাতভর ব্যস্ত রেখেছিল। এখন সবার নজর তাঁর চিকিৎসার দিকে—ঢাকায় চিকিৎসা শেষে তিনি কবে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ও কর্মস্থলে ফিরতে পারেন, সেটিই এখন প্রধান প্রশ্ন।



