মিনেসোটায় চলন্ত স্কুলবাস থামিয়ে ১৯ শিশুর প্রাণ বাঁচালেন যুবক, বললেন কুরআনের আয়াতই অনুপ্রেরণা
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় চালক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসা একটি স্কুলবাস থামিয়ে ১৯ জন শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছেন এক যুবক। চলন্ত বাসে লাফিয়ে উঠে জরুরি ব্রেক টেনে তিনি বাসটি থামান। পরে তিনি জানান, পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতই তাঁকে এই কাজে অনুপ্রাণিত করেছে — যেখানে বলা হয়েছে, একটি জীবন রক্ষা করা মানে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করা।
ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার বিকেলে মিনেসোটার সেন্ট পলে। ২৭ বছর বয়সী ইব্রো আহমেদ তাঁদের পারিবারিক কনভেনিয়েন্স স্টোর ‘ইয়া ব্রিকস স্ন্যাকস অ্যান্ড টোব্যাকো’র বাইরে বিরতির সময় ফুটবল নিয়ে খেলছিলেন এবং মোবাইল দেখছিলেন। ঠিক সেই সময় দরজা খোলা অবস্থায় একটি হলুদ স্কুলবাসকে তাঁর সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখেন তিনি।
আহমেদ জানান, বাসচালকের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন মারাত্মক কোনো সমস্যা হয়েছে, যা মৃগী রোগ বা খিঁচুনির লক্ষণ হতে পারে। পরিস্থিতি দেখেই তিনি দৌড়ে বাসের দিকে যান, লাফ দিয়ে দরজার ভেতরে ঢোকেন এবং দুই হাত খালি করতে নিজের ফোন ও চশমা সামনে থাকা দুটি মেয়ের দিকে ছুড়ে দেন।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন কোনোভাবে বাসটি ‘পার্ক’ গিয়ারে দেবেন। কিন্তু চারপাশে আতঙ্কিত শিশুদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে আহমেদ বাসের জরুরি ব্রেক টেনে ধরেন। এতে বাসে থাকা কোনো যাত্রী কিংবা রাস্তার কেউ হতাহত না হয়েই গাড়িটি থেমে যায়। বাস থামানোর পর তিনি শিশুদের একজনকে জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করতে বলেন। পুরো ঘটনাটি দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
সেন্ট পল পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্ট শুক্রবার এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, সেদিন আহমেদের পরিবারের দোকানের বাইরে বাসে একটি চিকিৎসা-জরুরি ঘটনা ঘটেছিল এবং প্যারামেডিকদের ঘটনাস্থলে আসতে হয়েছিল। ডিস্ট্রিক্ট জানায়, বাসে থাকা ১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে পরে আরেকটি বাস পাঠানো হয়। চালককে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তিনি এখন বাড়িতে বিশ্রামে আছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আহমেদের চলন্ত বাসে দৌড়ে ওঠার ফুটেজ প্রকাশের পর ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার সেন্ট পলে পারিবারিক দোকানের সামনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমেদ বলেন, তিনি সংখ্যার হিসাব করা মানুষ, আর এই সংখ্যাটা তাঁর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। তিনি এটা নিজের জন্য করেননি; তাঁর ভাষায়, ঈশ্বরের নামে এটি ছিল এক নিঃস্বার্থ কাজ।
আহমেদ আরও জানান, ‘গ্রে’স অ্যানাটমি’ নামের একটি বিখ্যাত চিকিৎসা-বিষয়ক টিভি নাটক তাঁকে শিখিয়েছিল, যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা কখনো ভাবাও যায় না, তেমন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়। তবে সোমবারের সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁর মনে জেগে ওঠে কুরআনের সেই বাণী — ‘যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ এটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতের অংশ।
ন্যাশনাল সেফটি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ শিশু স্কুলবাসে যাতায়াত করে। সংখ্যাটি এত বড় যে মাঝে মাঝে চালকসংক্রান্ত জরুরি ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এমন ঘটনায় উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া পথচারীরাই প্রায়ই বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেন — আহমেদের ঘটনা তারই উদাহরণ।
সাক্ষাৎকারে আহমেদ তাঁর পরিবারের কঠিন সময়ের কথাও তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এই যুবকের বাবা-মা পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া থেকে আসা অভিবাসী। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যাপক বিতাড়ন অভিযান এবং ‘অপারেশন মেট্রো’ নামের অভিযানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় অভিবাসন এজেন্টরা সেন্ট পল ও পাশের মিনিয়াপোলিসে অভিযান শুরু করার পর থেকে তাঁদের দোকানের বিক্রি কমে যায়। তাঁর ভাষায়, পূর্ব আফ্রিকার একটি ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সময়টা খুবই কঠিন ছিল।
এই ঘটনার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ একটি স্থানীয় বিপণন ও মিডিয়া কোম্পানি আহমেদকে ১ হাজার ডলার পুরস্কার দিয়েছে। তাঁকে অন্তত একটি প্যানেল আলোচনায় কথা বলার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সিটি কাউন্সিলের এক সদস্য অভিনন্দন জানাতে যোগাযোগ করেছেন। ইউরোপে থাকা তাঁর এক চাচাও খবর দেখে ফোন করেছিলেন।
আহমেদ বলেন, এই সুযোগের মাধ্যমে তিনি ইরিত্রিয়ানদের এবং পূর্ব আফ্রিকানদের একটি সুন্দর ও ইতিবাচক আলোয় তুলে ধরতে পেরেছেন। তাঁর গল্পটি ইরিত্রিয়ানদের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সাড়া ফেলেছে। আবেগভরে তিনি বলেন, নিজের মানুষকে ইতিবাচকভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে তিনি সত্যিই গর্বিত।






