থামল মহান শিল্পীর তুলি: ৮৭ বছর বয়সে চলে গেলেন যোগেন চৌধুরী
ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার এক বিশিষ্ট অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চলে গেলেন দুই বাংলার খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। রোববার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
সম্প্রতি দুর্গাপূজার সময় নতুন করে মূত্রনালীর সংক্রমণ দেখা দিলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের সম্মতিতে শনিবার রাতেই তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ক্যানসার ও সেপসিসের সঙ্গে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হেরে যান তিনি।
১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর জীবন ও শিল্পে গভীর ছাপ রেখেছিল দেশভাগের ট্র্যাজেডি।
উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের অসহায়তা এবং চারপাশের অসঙ্গতিকে তিনি তাঁর অনন্য শিল্পভাষায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কালি, প্যাস্টেল ও জলরঙের ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক শৈলী।
তাঁর তুলিতে মানুষের ফোলা বা ভাঙাচোরা মুখাবয়বও হয়ে উঠত গভীর মানবিক অনুভূতির জীবন্ত প্রতীক। শিল্পের এই নিজস্ব ভাষাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ১৯৫৫ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা ও ডিজাইনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে পাড়ি জমান যোগেন চৌধুরী। সেখানকার বিখ্যাত একোল দে বোজার এবং আতেলিয়ে ১৭-এ অঙ্কন ও ছাপচিত্রের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
ইউরোপীয় শিল্পচর্চার এই অভিজ্ঞতা তাঁর রেখা ও রঙের ব্যবহারে যোগ করেছিল এক নতুন মাত্রা। দেশে ফিরেও সেই অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর কাজে থেকে গিয়েছিল।
কেবল তুলি আর ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁর অবদান। প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি রেখে গেছেন গভীর ছাপ। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এ ছাড়া বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনা করেন এবং পরবর্তীতে প্রধানের দায়িত্বও সামলান। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ভারতের অন্যতম সম্মানজনক বেসামরিক খেতাব পদ্মভূষণসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ফরাসি সরকারও তাঁর শিল্পকর্মের বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছিল।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষভাগে রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এই গুণী শিল্পী।
যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শিল্পজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। ফরিদপুরের কৃতি সন্তান হিসেবে দুই বাংলার মানুষের কাছেই তাঁর স্মৃতি থেকে যাবে।




