বি-আর পাওয়ারজেনের প্রধান প্রকৌশলীর অপসারণ অবৈধ, পুনর্বহালের নির্দেশ হাইকোর্টের
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী মো. মাহবুব কবিরকে চাকরি থেকে অপসারণের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাঁকে অবিলম্বে তাঁর পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। রোববার (২৫ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে। ওই বছরের ২৩ জুন মিরসরাই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জেনারেটরের উৎস সংক্রান্ত জটিলতার প্রেক্ষাপটে অসদাচরণের অভিযোগ এনে প্রধান প্রকৌশলী মাহবুব কবিরকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
রায়ে আদালত বলেন, এই অপসারণ প্রক্রিয়া ছিল প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। কারণ, বিভাগীয় তদন্তে কোনো সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগই দেওয়া হয়নি, যা ন্যায়সংগত তদন্তের মৌলিক শর্ত।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ দেন, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস সবুর নিজেই ছিলেন মূল অভিযোগকারী এবং স্বার্থের সংঘাতযুক্ত পক্ষ। অথচ তিনিই অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া বোর্ড সভায় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছেন।
এই প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেন, ‘কেউ নিজের মামলায় নিজেই বিচারক হতে পারে না’—এই সর্বজনীন আইনি নীতি এখানে প্রকাশ্যভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
রায়ে একটি চাঞ্চল্যকর প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির চিত্রও উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত কোম্পানির তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ৫৬ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদনে মাহবুব কবিরের অপসারণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছিল।
কিন্তু কোম্পানির বোর্ড সেই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে না পাঠিয়ে তা ধামাচাপা দেয়। উল্টো তদন্ত কর্মকর্তাদের শোকজ ও নানা চাপ প্রয়োগ করে তাঁদের কাছ থেকে লিখিত ক্ষমা প্রার্থনা আদায় করা হয়।
এরপর মূল অনিয়মের সব পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে মাত্র আট পৃষ্ঠার একটি পরিবর্তিত প্রতিবেদন তৈরি করানো হয়। বোর্ডের এই পদক্ষেপকে হাইকোর্ট আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন।
অপসারণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করা হলে কোম্পানির পক্ষ থেকে রিটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আদালত সেই আপত্তি খারিজ করে দিয়েছেন।
পর্যবেক্ষণে আদালত স্পষ্ট করেন, শতভাগ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বি-আর পাওয়ারজেন জনস্বার্থমূলক কাজ সম্পাদন করে। ফলে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট সরাসরি গ্রহণযোগ্য।
এই রায়ের ফলে ছয় বছর আগে চাকরিচ্যুত প্রধান প্রকৌশলী মাহবুব কবিরের পদে ফেরার পথ খুলে গেল। রায়টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।






