সার্বিয়ায় রেকর্ড ভোটার উপস্থিতির আভাস, ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে ভুচিচের দল মুখোমুখি

সার্বিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে ভোটারদের বড় উপস্থিতির আভাস মিলেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত ৪৬ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের আগের নির্বাচনের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ বেশি।
এই নির্বাচনে ছাত্র প্রতিবাদ আন্দোলন দীর্ঘদিনের ডানপন্থী জনপ্রিয়তাবাদী নেতা আলেকসান্দার ভুচিচ ও তার সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে (এসএনএস) ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। এসএনএস ২০১২ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে।
ভুচিচের ডাকা এই আগাম নির্বাচনের পেছনে রয়েছে দুই বছর ধরে চলা ছাত্র প্রতিবাদ। ২০২৪ সালে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা থেকেই এই প্রতিবাদের সূত্রপাত, যাকে দুর্নীতি ও অবহেলার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল।
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের 'স্টুডেন্ট লিস্ট' তাদের ইশতেহারে বলেছে, প্রতিবাদীদের ওপর দমন-পীড়নে নিয়ম ভাঙা কর্মকর্তাদের সরানো হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় আনুগত্যশীলদের বসানো বন্ধ হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হবে। ভুচিচ ও এসএনএস দুর্নীতি এবং গণমাধ্যমে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বেশির ভাগ ভাষ্যকারের মতে, চূড়ান্ত ভোটার উপস্থিতি ৬৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে তা ছাত্রদের পক্ষে যাবে। ভোটগ্রহণ শেষ হবে রাত ৮টায়, এর দুই ঘণ্টা পর ফলের প্রথম আভাস পাওয়া যেতে পারে।
সার্বিয়ার বড় শহর ও ছোট শহরগুলোর পাশাপাশি বিদেশের কেন্দ্রগুলোতেও লম্বা লাইন দেখা গেছে। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউবলিয়ানা, মিউনিখ, লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগোতে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়েছেন; প্যারিসে ভারী বৃষ্টির মধ্যেও সার্বীয় ভোটারদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
দেশজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজধানী বেলগ্রেডে প্রজাতন্ত্র নির্বাচন কমিশনের (আরআইকে) আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। কাছের সড়কে গাড়ির জানালা নামিয়ে ছাত্রদের একটি সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল—'আই ওয়ান্ট থ্রি কিসেস' লোকগানটি ছাত্রদের পছন্দ, কারণ ব্যালট পেপারে স্টুডেন্ট লিস্টের ক্রমিক নম্বর তিন। কাছের ফুটপাতে তরুণদের নাচতেও দেখা গেছে।
ব্যালটে ভুচিচ ও এসএনএস রয়েছে এক নম্বরে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই মেয়াদ শেষ করা ভুচিচ তৃতীয় মেয়াদে প্রার্থী হতে পারবেন না, তাই তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরতে চাইছেন, যে পদ তিনি ২০১৭ সালে ছেড়েছিলেন।
দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে ভুচিচের শক্ত সমর্থন রয়েছে; তারা তাকে দেশের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখেন। গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথাও তিনি তুলে ধরতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সার্বিয়ার প্রার্থিতাকে সমর্থন করলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন; তিনি পেনশন ও সরকারি খাতের বেতন বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার ভিডিওতে ভুচিচ বলেছেন, 'এই হাতগুলোই সার্বিয়াকে তাদের তালুতে ধরে রেখেছে। আর এই হাত দিয়েই, শান্তভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে, আমরা যা শুরু করেছি তা শেষ করব।' এসএনএসের পোস্টারে সংহতির প্রতীক হিসেবে দুটি হাত জড়িয়ে থাকার ছবি রয়েছে—চিকিৎসক ও নার্স, কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের হাত।
এসএনএসের পক্ষ থেকে নির্বাচনী জালিয়াতির আশঙ্কায় ছাত্ররা সার্বিয়ার ৮ হাজার ২১০টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে অন্তত দুজন করে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে।
রোববার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দক্ষিণের শহর নিসের একটি ক্যাফে দেখা গেছে, যেখানে অভিযোগ অনুযায়ী 'চেইন ভোটিং' নামে পরিচিত পদ্ধতিতে আগেভাগেই ব্যালট পেপার পূরণ করা হচ্ছিল। ক্যাফের জানালায় 'প্রাইভেট পার্টি' লেখা সাইন ছিল; ধারণ করা হচ্ছে বুঝতে পেরে কাগজপত্র দ্রুত লুকিয়ে ফেলা হয়। কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ঝারকো কোরাচ বলেছেন, 'আমরা ইউরোপের সমসাময়িক ইতিহাসে এক অনন্য পরীক্ষার সাক্ষী হচ্ছি।' নিজেরা প্রার্থী না হয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় অনুষদগুলোর ছাত্রনেতৃত্বাধীন সমাবেশ ২৫০ জন প্রার্থী বেছে নিয়েছে; তালিকার শীর্ষে রয়েছেন নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইলিয়া সর্দানোভিচ, তবে জিতলে তিনিই যে সার্বিয়ার নেতৃত্ব দেবেন তা নয়। তালিকায় চিকিৎসক, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরাও রয়েছেন।
কোরাচ বলেছেন, এই প্রার্থীরা একে অন্যকে চেনেন না এবং তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কেও ধারণা নেই, ফলে জিতলে তারা কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবেন কি না তা অনুমান করা কঠিন। অন্যদিকে ভুচিচ সন্ধ্যায়, সম্ভবত গভীর সন্ধ্যায়, বিজয় ঘোষণা করলে ছাত্ররা তা মেনে নেবে না বলেও তিনি মনে করেন। ছাত্ররা জিতলে উচ্চপদে থাকা অনেক সাবেক ভুচিচ-অনুগত শেষ মুহূর্তে পক্ষ বদলাতে পারেন; আর ঘনিষ্ঠ ফলাফলে দুই পক্ষই বিজয় দাবি করলে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে বলে কোরাচের মত।
সার্বিয়ায় ভোটার সংখ্যা ৬৪ লাখ ৫০ হাজার, যেখানে মোট জনসংখ্যা ৬৫ লাখ ৩০ হাজার—এই হিসাব ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কসোভোর সার্ব এবং প্রতিবেশী বসনিয়ার দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সার্বদেরও ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে।




