এআইয়ের ‘সুযোগ বিভাজন’ বৈশ্বিক বৈষম্য আরও গভীর করতে পারে: জাতিসংঘ কর্মকর্তার সতর্কবার্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য গভীর করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। উন্নয়নশীল দেশগুলো এআই বিপ্লবের সুফল পেতে বড় বাধার মুখে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) উপ-মহাসচিব টমাস লামানাউসকাস কাতারের দোহায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আঙ্কটাড) বিশ্ব বিনিয়োগ ফোরামের ফাঁকে আল জাজিরাকে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, উদ্বেগ শুধু ডিজিটাল বিভাজন নয়, এআই বিভাজনই বড় উদ্বেগ, কারণ এআই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জনসেবা, শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যে বিশাল সম্ভাবনা রাখে, তাই বড় বিভাজন মানেই সুযোগের বিভাজন, যা আর্থসামাজিক বিভাজনকে গভীর করতে পারে।
লামানাউসকাস বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামোতেই বৈষম্য স্পষ্ট। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা মিলিয়ে বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার সক্ষমতার মাত্র ৩.৩ শতাংশ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে ২২০ কোটি মানুষ এখনো ইন্টারনেট সংযোগের বাইরে রয়েছে বলেও তিনি জানান।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল, এআই দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্যের নতুন যুগের সূচনা করতে পারে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার দশকের অগ্রগতি উল্টে দিতে পারে। অবিশ্বস্ত বিদ্যুৎ, সীমিত সংযোগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব থাকা দেশগুলো এআইয়ের অর্থনৈতিক সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।
লামানাউসকাস জানান, ডিজিটাল অবকাঠামোর ব্যবধান ঘোচাতে ২০৩০ সালের মধ্যে আনুমানিক ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এআই গ্রহণের ক্ষেত্রেও দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান রয়েছে: উন্নত দেশগুলোতে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের প্রায় ২৯ শতাংশ জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার ১৬ শতাংশ।
চাকরি নিয়েও তথ্য দিয়েছেন তিনি। তার উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তি ৯ কোটি চাকরি স্থানচ্যুত করতে পারে, আবার ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি করতে পারে। তবে সামগ্রিক ফল ইতিবাচক হলেও অনেক মানুষ ব্যক্তিগতভাবে বিঘ্নের মুখে পড়বেন, কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ দক্ষতা বদলে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
ভাষাগত বৈষম্যের কথাও তুলে ধরেন লামানাউসকাস। তিনি জানান, এআই অনুবাদ টুলে আফ্রিকার ভাষাগুলোর মাত্র ৭ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, যা লাখ লাখ সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার সীমিত করছে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি মানুষ চিকিৎসা স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া ও লেখালেখিসহ নানা কাজে এআই ব্যবহার করেন। প্রতিবেদনটির হিসাব অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ৪০ শতাংশ চাকরি এআই-সংক্রান্ত প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই নিরাপত্তা ও শাসন বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ গবেষক ফজল বারেজ আল জাজিরাকে বলেন, ভয়গুলো বাস্তব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কাজ স্বয়ংক্রিয় করা আর পুরো চাকরি প্রতিস্থাপনের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি; নিয়মিত জ্ঞানভিত্তিক কাজ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকলেও এর মাত্রা এখনো অনিশ্চিত বলে তিনি জানান।



