কক্সবাজারে শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়: সৈকতে টার্গেট পর্যটক ও পথচারী, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৩৬

কক্সবাজার শহর ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব চক্রে স্থানীয় কিশোরদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা কিশোর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তরুণদের সম্পৃক্ততার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে উঠে এসেছে।
আধিপত্য বিস্তার, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নিজেদের মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের সদস্যরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পর্যটন মৌসুমে তাদের একটি অংশের টার্গেটে থাকেন পর্যটক ও নিঃসঙ্গ পথচারীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, উঠতি বয়সের এসব ছেলেকে ব্যবহার করছে এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তি ও কথিত ‘বড় ভাই’রা।
সৈকতকেন্দ্রিক সুগন্ধা, শৈবাল, সিগাল, ডিভাইন পয়েন্ট, কবিতা চত্বর, ঝাউবন, কলাতলী ও মেরিন ড্রাইভের কিছু নির্জন এলাকায় সন্ধ্যার পর তাদের আনাগোনা বাড়ে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কখনো পর্যটকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, আবার কখনো মাদক বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, কলাতলী মোড়, সুগন্ধা মোড়, কলাতলী বাইপাস, লাইটহাউস, নূরপাড়া, পেশকারপাড়া, হাসপাতাল সড়ক, এন্ডারসন রোড, সাহিত্যিকা পল্লী, পাহাড়তলী, ল্যাবরেটরি স্কুল রোড, ভোলাইয়ার ঘোনা, টেকপাড়া ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন নির্জন এলাকাকেও কিশোরদের অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন স্থানীয়রা।
শহরের বৈদ্যঘোনা এলাকার বাসিন্দা নছর উল্লাহ বলেন, “সন্ধ্যার পর পথচারী ও পর্যটকদের গতিরোধ করে ভয়ভীতি দেখানো হয়। কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার পথে গোলদিঘীর পাড়ে কিশোররা দলে দলে অবস্থান করে। এসব নিয়ে আমরা স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক রয়েছে। ছুরি-চাপাতি নিয়ে হামলার আশঙ্কায় অনেকে রাতে চলাচল এড়িয়ে চলি।”
সম্প্রতি খুরুশকুল নতুন ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রায়হান। তিনি বলেন, “দোকান বন্ধ করে মিশুকে করে বাড়ি ফেরার সময় একদল যুবক আমাদের গাড়ি থামায়। ছুরি দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা ও একটি স্মার্টফোন নিয়ে যায়। পরে কাউকে কিছু না জানানোর হুমকি দেওয়া হয়।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, পরিচয় আড়াল করতে অপরাধীরা কখনো হকার, ইজিবাইকচালক, দিনমজুর কিংবা পথশিশুর বেশ নেয়। সুযোগ বুঝে দলবদ্ধভাবে অপরাধ করে তারা দ্রুত এলাকা ছাড়ে। বাস টার্মিনাল, শহরের প্রবেশমুখ, সৈকতসংলগ্ন সড়ক এবং পর্যটকদের চলাচল বেশি এমন স্থানগুলোতে তাদের তৎপরতা বেশি দেখা যায়।
কয়েকটি গ্রুপে রোহিঙ্গা কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। হাসান শরীফ নামে এক রোহিঙ্গা কিশোর জানায়, অনেক কিশোর ইয়াবার পাশাপাশি গাড়ির টায়ার-টিউব ও জুতা মেরামতে ব্যবহৃত সলিউশন বা গাম শুঁকে নেশা করে। নেশার টাকা জোগাড় করতে তাদের কেউ কেউ ছিনতাই, চুরি ও মাদক বিক্রিতে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদকের সহজলভ্যতা কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ।
এদের পেছনে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, চিহ্নিত অপরাধী ও কথিত ‘বড় ভাই’দের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোক জড়ো করা, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে কিশোরদের ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে অর্থ, মাদক, আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আইনি সহায়তার আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, “পরিবারের নজরদারির অভাব এবং পাড়া-মহল্লার কিছু অসাধু ব্যক্তির স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। উঠতি বয়সের ছেলেদের সঠিকভাবে পরিচালনা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং তাদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। একইসঙ্গে কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধ করাচ্ছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।”
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার প্রভাব পড়ছে পর্যটন ব্যবসায়ও। সুগন্ধা পয়েন্টের ব্যবসায়ী আরফিন বলেন, “পর্যটন মৌসুমেও রাতে বাড়তি সতর্কতা নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। অনেক পর্যটক সন্ধ্যার পর সৈকতের নির্জন অংশে যেতে চান না।”
কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশ শহরের বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় দেশীয় অস্ত্র, নিষিদ্ধ মাদক ও মাদক বিক্রির অর্থ জব্দ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, “চুরি, দস্যুতা ও মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য ধারায় মামলা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হুসাইন বলেন, সৈকতে ভাসমান অপরাধী ও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৫৫ ভাসমান অপরাধী ও ১৫ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাই হওয়া ১০টি মোবাইল ফোন।
সচেতন মহল বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান যথেষ্ট নয়। মাদকের বিস্তার রোধের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো, ঝরে পড়া কিশোরদের চিহ্নিত করা, কাউন্সেলিং এবং খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।




