…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › লাইফস্টাইল › খবর
লাইফস্টাইল

এভারেস্ট থেকে কে-টু: সাত শৃঙ্গজয়ী ওয়াসফিয়া নাজনীনের পর্বতারোহণের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
এভারেস্ট থেকে কে-টু: সাত শৃঙ্গজয়ী ওয়াসফিয়া নাজনীনের পর্বতারোহণের গল্প
ছবি: সংগৃহীত

পর্বতারোহণ শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও প্রশিক্ষণের কঠিন পরীক্ষা। দুর্গম পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতা ও মৃত্যুঝুঁকি অতিক্রম করে পর্বতারোহীরা চূড়ায় পৌঁছান। ওয়াসফিয়া নাজনীন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্বতারোহী, যিনি দেশের পতাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ কয়েকটি শৃঙ্গে তুলে ধরেছেন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ছিল তার জন্মদিন। ১৯৮২ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম ওয়াসফিয়া নাজনীনের। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে মানবাধিকার, সমাজসেবা ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ থেকেই পর্বতারোহণে যুক্ত হন তিনি।

পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা। ওয়াসফিয়া ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকাকে আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণের পরিসরে তুলে ধরার লক্ষ্য নেন।

২০১২ সালের মে মাসে ওয়াসফিয়া নাজনীন মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করেন। ২৬ মে তিনি চূড়ায় পৌঁছান এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী হিসেবে এভারেস্ট জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন। ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার উচ্চতার চূড়ায় তিনি বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১১ সালে ওয়াসফিয়া ‘বাংলাদেশ অন সেভেন সামিটস’ অভিযান শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ জয় করা। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, নারীর অংশগ্রহণ ও পর্বতারোহণের সম্ভাবনা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

সাতটি শৃঙ্গের প্রতিটির পরিবেশ ও ঝুঁকি আলাদা। কোথাও তুষারঝড়, কোথাও বরফের ফাটল, আবার কোথাও অক্সিজেনের স্বল্পতা ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ।

২০১৫ সালের নভেম্বরে কার্সটেনজ পিরামিড জয়ের মাধ্যমে তিনি সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের অভিযান সম্পন্ন করেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশি ও প্রথম বাঙালি হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।

২০২২ সালের ২২ জুলাই ওয়াসফিয়া নাজনীন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কে-টু জয় করেন। এটি ছিল কোনো বাংলাদেশির প্রথম কে-টু জয়।

কে-টু তার উচ্চতা, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও কঠিন আরোহণপথের জন্য পরিচিত। এই অভিযানে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা, সতর্কতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওয়াসফিয়ার এই সাফল্য বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

পর্বতারোহণের বাইরে ওয়াসফিয়া নাজনীন মানবাধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়েও কাজ করেছেন। তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে প্রকৃতির সঙ্গে দায়িত্বশীল সহাবস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

পর্বতারোহণে তার সাফল্য নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ, সুযোগ ও প্রস্তুতি থাকলে নারীরাও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নিতে পারেন।

তার কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক তাকে ২০১৪–১৫ সালের ‘অ্যাডভেঞ্চারার অব দ্য ইয়ার’ সম্মান দেয়। ২০১৬ সালে তিনি সংস্থাটির ‘এমার্জিং এক্সপ্লোরার’ নির্বাচিত হন।

ওয়াসফিয়া নাজনীনের পর্বতারোহণের সাফল্য বাংলাদেশের ক্রীড়া ও অভিযাত্রার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এভারেস্ট, সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এবং কে-টু জয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়িয়েছেন। তার জীবন থেকে বোঝা যায়, পর্বতারোহণে সাফল্যের জন্য স্বপ্নের পাশাপাশি দীর্ঘ প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন।