শুঁটকি মৌসুমে সুন্দরবনে যাচ্ছেন হাজারো জেলে, মাথায় ঋণের বোঝা আর দস্যুর আতঙ্ক

মাথায় মহাজনের ঋণ, জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের আতঙ্ক, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আর ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশের শঙ্কা — চতুর্মুখী সংকটের মধ্য দিয়ে আগামীকাল শুক্রবার সুন্দরবনে শুঁটকি উৎপাদনে যাচ্ছেন হাজারো জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী।
আগামী পাঁচ মাস সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন চরে অস্থায়ী স্থাপনা ও মাচা তৈরি করে চলবে শুঁটকি উৎপাদনের এই মৌসুম। সাগর থেকে মাছ শিকার করে মাচায় শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করবেন জেলেরা।
এরই মধ্যে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খাদ্য, জ্বালানি, মাছ ধরার জালসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনে নৌকা গুছিয়ে নিচ্ছেন জেলেরা। আজ বৃহস্পতিবার থেকে দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা তাঁদের। এবার শুঁটকিপল্লি থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ কোটি টাকা।
বনদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে জেলেদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ। নৌকাগুলো পাশাপাশি রাখা এবং গভীর সমুদ্রে ও গহিন বনে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাঁদের। বন বিভাগের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও কোস্ট গার্ড বিশেষ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ মোট জলসীমার আয়তন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাছ আহরণ কার্যক্রম ২০০ মিটার গভীরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রায় ২৩৭টি শিল্প ট্রলার এবং ২৮ হাজার ৫৭৫টি যান্ত্রিক ও প্রচলিত নৌযান দিয়ে মাছ আহরণ করা হয়।
বর্তমানে খুলনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫ জন। তাঁদের মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যান; প্রতিবছর এই সংখ্যা বাড়ছে। শুধু পাইকগাছার ১০টি গ্রামেই এই সংখ্যা দেড় হাজার। তবে বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩ লাখ জেলে বসবাস করেন, যাঁদের অধিকাংশই ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সমুদ্র ও উপকূলবর্তী এলাকায় মাছ ধরেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুবলার চরের চারটি শুঁটকিপল্লি থেকে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বৈরী আবহাওয়া ও দস্যুদের তৎপরতার কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। গত মৌসুমে ৫ হাজার ৪৩১ দশমিক ৭ টন শুঁটকি উৎপাদন থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ ২২ হাজার ৪৯৩ টাকা।
গতকাল বুধবার খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের জেলে বিশ্বাস শঙ্কর জানান, তিনি ৪০ জন জেলেসহ পাঁচটি নৌকার বহর নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মহাজনের ঋণ নিয়ে বহর সাজিয়েছেন। কিন্তু সাগরে ভারতীয় জেলেদের আধিক্য ও বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কারণে তাঁরা চিন্তিত।
আরেক জেলে বরাম সরদার বলেন, ‘এবারের মৌসুমে সাগরে তেমন ইলিশ পাইনি। ভারতীয় জেলেদের কারণে গভীর সমুদ্রেও যেতে পারিনি। কাজেই এবার আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তা ছাড়া মাছ ধরা পড়লে তার একটি অংশ বনদস্যুদের দিতে হয়। সব মিলিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।’
দুবলার চর ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাগরে দস্যুদের তৎপরতার কারণে এই ব্যবসা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন দস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবর শোনা যাচ্ছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে দস্যু বাহিনীগুলোকে।
খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সাগরে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তায় বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে। তবে গভীর সমুদ্রে একা যেতে নিষেধ করা হয়েছে; রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে থাকার কথাও বলা হয়েছে।
ইমরান আহমেদ আরও বলেন, জেলে ঘর, ডিপো ঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনীয় সব নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। ৩০ অক্টোবর থেকে শুঁটকিপল্লিতে ঘর তৈরির কাজ শুরু হবে; একই সঙ্গে সাগরে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কার্যক্রমও শুরু হবে।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে। শুঁটকির সবচেয়ে বড় মোকাম দুবলার চরে এসআরবির অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকে ফোর্স কাজ করে।’
কোস্ট গার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, আসন্ন শুঁটকি আহরণ মৌসুমকে কেন্দ্র করে মৎস্যজীবীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।




