জীবনযাত্রার ব্যয়ে ক্ষোভ ছড়াচ্ছে ইউরোপজুড়ে, রাস্তায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ

ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে আছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও গ্রিসে ঋণ পরিশোধে সুদের হার বাড়ছে। ফলে স্কুল পুনর্গঠন, আবাসনে ভর্তুকি কিংবা খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের মতো কাজে যে অর্থ ব্যয় হতো, তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণদাতাদের পাওনা মেটাতে।
ফ্রান্সে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ইতালিতে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা। স্পেনের ঐতিহাসিক চত্বরগুলোতে প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্যারিস ও রোমে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক দিন আগে তাদের সঙ্গে রাস্তায় নামে লাখো মানুষ।
ফ্রান্সের গ্রিন পার্টির এমপি পোরিয়া আমির শাহি বলেছেন, গত ৫০ বছরেও কোনো প্রজন্মকে এত কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি।
গত মাসে মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত নারীকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় স্পেনজুড়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। আবাসনের নিরাপত্তা ও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাস্তায় নামে মানুষ। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে স্পেনে বাড়ির দাম বেড়েছে ৮০ শতাংশ, অথচ একই সময়ে বেতন বেড়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ।
একই ধরনের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে পর্তুগালেও। অতিরিক্ত পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে দেশটিতে বাড়ির দাম ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আলবেনিয়ায় মে মাস থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছে মানুষ। তাদের অভিযোগ, সরকার ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীরা সরকারের পদত্যাগ দাবি করে।
শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, নিরাপদ স্কুলভবন ও সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে গত সপ্তাহে এথেন্সসহ গ্রিসের প্রায় ৫০টি শহরে রাস্তায় নামে হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। জার্মানিতে বার্লিন ও হ্যানোভারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে ছোট পরিসরে সমাবেশ হয়েছে।
ইতালির উত্তরের কয়েকটি শহরে কম মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন শহরে মোট বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার বলে ইতালির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রাই পুলিশের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার মিলানে পাঁচ শতাধিক সেনা মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, আন্দোলন করা সবার অধিকার, কিন্তু শহর ধ্বংস করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপরতা বেড়েছে। অনলাইন পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ভিসিব্রেইনের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের একদিনে ঘণ্টায় বিক্ষোভ নিয়ে ২২ লাখের বেশি টুইট করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
তাপমাত্রা কমছে, অথচ জ্বালানিসংকট কাটার লক্ষণ নেই। জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের এনার্জি সেন্টারের প্রধান ফুক-ভিন নগুয়েন বলেছেন, জার্মানির গ্যাসের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি চলে গেছে। গ্যাসের দাম বাড়লে জার্মান পরিবারগুলোর ঘর গরম রাখার খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।




