ঋণ আর দস্যু আতঙ্ক নিয়েই দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুমে যাচ্ছেন হাজারো জেলে, প্রথমবার বসছে ভাসমান হাসপাতাল

সুন্দরবনের দুবলার চরে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম। মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া লাখ লাখ টাকা ঋণ, সাগরে বনদস্যুদের অপহরণ ও চাঁদাবাজির আতঙ্ক, মাছ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা আর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হাজার হাজার জেলে ইতিমধ্যে মোংলার উপকূলীয় নদ-নদীতে জড়ো হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত উপকূলীয় নদ-নদীতে জড়ো হওয়া জেলেদের কেউ কেউ মধ্যরাত থেকে, আবার অনেকে শুক্রবার ভোরে সাগরের উদ্দেশে রওনা হবেন। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাঁরা জাল, বরফ, খাবার, জ্বালানি ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে ট্রলার প্রস্তুত করেছেন।
এবারের শুঁটকি মৌসুম চলবে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত। এই পাঁচ মাসের আয়ই উপকূলের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের সারা বছরের জীবিকার বড় ভরসা। মৌসুম শেষে মাছ বিক্রির আয় থেকে মহাজনের ঋণ পরিশোধ করার কথা থাকলেও মাছ কম পাওয়া, দস্যুদের চাঁদাবাজি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে সেই হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌসুম ঘিরে দুবলার চরের আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে প্রায় ১০ হাজার জেলে ও মহাজনের সমাগম হতে পারে। তাঁদের থাকার জন্য ৯০০টি অস্থায়ী ঘর, মাছ বেচাকেনার জন্য ১০০টি ডিপো এবং মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের ১০০টি দোকানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুঁটকি উৎপাদন, মাছ আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাসহ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
বঙ্গোপসাগর উপকূলে সুন্দরবনের দুবলার চর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র। রাসায়নিক ব্যবহার না করে রোদে মাছ শুকানো হয় বলে এখানকার শুঁটকির স্বাদ ও গন্ধের আলাদা কদর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। দুবলার চরে উৎপাদিত শুঁটকি চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, রংপুর ও ঢাকাসহ দেশের বড় বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। মাছের একটি অংশ আবার বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করে ট্রলারে পাঠানো হয় খুলনা, বাগেরহাট ও ঢাকাসহ বিভিন্ন পাইকারি আড়তে। দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এসব শুঁটকির চাহিদা রয়েছে।
মাছের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি জেলেদের বড় উদ্বেগ বনদস্যুদের উৎপাত। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মাছের ভাগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুঁটকি মৌসুম সামনে রেখে নতুন নতুন দস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে জেলে ও মহাজনদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
দুবলার চর ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দস্যুদের তৎপরতায় শুঁটকি ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের দস্যু বাহিনীগুলোকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।
জেলেদের নিরাপত্তায় বন বিভাগ সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। গভীর সমুদ্রে একা না যাওয়া, রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করা এবং সুন্দরবনের গহিনে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েনের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও কোস্ট গার্ড বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ইতিমধ্যে ছয়টি বনদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। দুবলার চরে এসআরবির অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে, সেখান থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, আসন্ন শুঁটকি আহরণ মৌসুমে মৎস্যজীবীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।
পাঁচ মাসের মৌসুমে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসেও থামে না মাছ শুকানোর কাজ। এ সময় ট্রলার ডুবে যাওয়া, বৃষ্টিতে মাছ পচে যাওয়া কিংবা শুকানোর কাজে ব্যাঘাত ঘটলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন জেলেরা। টানা বৃষ্টি হলে চাতালে শুকাতে দেওয়া মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দুর্যোগের কারণে মাছ আহরণ বন্ধ থাকলেও নৌকা, শ্রমিক, খাবার ও জ্বালানির খরচ বহন করতে হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বন বিভাগ জানিয়েছে, জেলেদের অস্থায়ী ঘর, ডিপো ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। অনুমতি ছাড়া বনের গাছপালা কাটা বা ব্যবহার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দস্যু আতঙ্ক, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও দুর্গম এলাকায় অবস্থানের কারণে শুঁটকি মৌসুমে অসুস্থ জেলেদের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় এবারই প্রথম দুবলার চরে পাঁচ মাসের জন্য বসছে ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতাল। অসুস্থ জেলেদের চিকিৎসার পাশাপাশি গুরুতর রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য থাকবে একটি স্পিডবোট।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জেলেদের চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেই এবার প্রথমবারের মতো ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে পাঁচ মাস ধরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে দুটি অভিযান চলছে, এতে দস্যুতা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে জেলেদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, গত শুঁটকি মৌসুমে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি টাকা। এবার আট কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দস্যুদের কারণে জেলে ও মহাজনদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডকে রাতের টহল জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।




