মূল্যস্ফীতির চাপে সম্পদ বিক্রি ও ঋণে জড়াচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ: শহরের দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান অর্থনীতিবিদদের

মূল্যস্ফীতির চাপে খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে অনেক পরিবার সম্পদ বিক্রি করছে, ঋণ নিচ্ছে; এতে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা বাড়ানো এবং সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘খাদ্য নিরাপত্তার সতর্কবার্তা, পুষ্টি ও দরিদ্র্যাবস্থা এবং খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন।
সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, খাদ্যের দাম বাড়লে অনেক পরিবার প্রয়োজন মেটাতে সম্পদ বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে; এভাবে মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে যেসব পরিবারে শিশু ও প্রবীণ সদস্য রয়েছেন এবং যেসব পরিবার দিনমজুরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এসব পরিবারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অধ্যাপক বিদিশা আরও বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এ কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শহরের দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো জরুরি।
আলোচনা সভায় বক্তারা খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু খাদ্যের সরবরাহের বিষয় হিসেবে না দেখে মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের বক্তব্য, বাজারে খাদ্যপণ্য পাওয়া গেলেও মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এজন্য দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কৃষকেরাও অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার পান না। কৃষকেরা উৎপাদন করেন, বিক্রি করেন; কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা থাকে না। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে কৃষি, জ্বালানি ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খাদ্যে প্রবেশাধিকার ও সহজলভ্যতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা, কৃষি উৎপাদনের ব্যয় কমানো এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সবার জন্য সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে ভূমি সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ওয়েলথাঙ্গারহিলফে বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রামস মাল্টে শুমেলফেডার এবং সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের শিশু দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা তানিয়া শারমিন। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শিশুদের পুষ্টি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।




