ফিলিস্তিনপন্থি সুইডিশ শিক্ষাবিদ আন্দ্রেয়াস মাল্মের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ বাতিল করল হোম অফিস
যুক্তরাজ্য সফরের পরিকল্পনা করা ফিলিস্তিনপন্থি সুইডিশ শিক্ষাবিদ আন্দ্রেয়াস মাল্মকে দেশটিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। স্বরাষ্ট্র দপ্তর (হোম অফিস) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে তাঁর উপস্থিতি ‘জনস্বার্থের অনুকূল নয়’ বলেই এই সিদ্ধান্ত। আল জাজিরার দেখা এক ইমেইলে বুধবার মাল্মের ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) বাতিল করে হোম অফিস।
সিদ্ধান্তটি এসেছে মাল্মের লন্ডনে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেওয়ার এক সপ্তাহ আগে। ব্রিটিশ সমাজতান্ত্রিক ম্যাগাজিন ট্রিবিউন আয়োজিত ওই প্যানেলে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরিরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে; অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন প্যালেস্টাইন ডিপ ডাইভের হালা হানিনা।
মাল্ম আল জাজিরাকে বলেছেন, তাঁর বিশ্বাস, ওই প্যানেলে অংশ নেওয়ার কথা থাকার কারণেই তাঁর ইটিএ বাতিল হয়েছে। ব্যাখ্যা চেয়ে তিনি হোম অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তবে এখনও কোনো জবাব পাননি।
মাল্ম বলেন, তিনি কয়েক দশক ধরে নিয়মিত যুক্তরাজ্যে যাতায়াত করছেন এবং ফিলিস্তিন নিয়ে তাঁর অবস্থান সব সময়ই প্রকাশ্য ছিল। সর্বশেষ তিনি মে মাসে যুক্তরাজ্য সফর করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, মাঝের মাসগুলোতে তিনি ফিলিস্তিন নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি বা লেখেননি; একমাত্র বদলেছে প্যানেলে আম্মোরির সঙ্গে তাঁর আলোচনায় বসার বিষয়টি।
মাল্ম জানান, মে মাসে তিনি ইটিএ ব্যবহার করেই যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন, যাতে বছরের পরে আবার অনুমোদন ছাড়াই সফর করা যেত। বুধবারের ইমেইলের আগে ইটিএ ঝুঁকিতে থাকার কোনো ইঙ্গিত তিনি পাননি।
হোম অফিস ইমেইলে মাল্মকে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে যেতে চাইলে তাঁকে ভিসার আবেদন করতে হবে; তখন তাঁর পরিস্থিতি আরও বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। তবে সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী সাধারণ ভিজিটর ভিসা প্রক্রিয়া করতে তিন সপ্তাহ সময় লাগে — অর্থাৎ আবেদন মঞ্জুর হলেও আগামী সপ্তাহের প্যানেলের আগে ভিসা পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে যেতে ভিসা লাগে না, তাদের সাধারণত ইটিএ নিতে হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এই তালিকায় রয়েছে। মাল্মের ইটিএ বাতিলের কারণ এবং আগামী সপ্তাহের অনুষ্ঠানের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে কি না জানতে আল জাজিরা হোম অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব মেলেনি।
মাল্মের ইটিএ বাতিলের ঘটনা ঘটল যুক্তরাজ্য সরকারের ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীদের বিরুদ্ধে বিস্তৃত দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে, যা শুরু হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের আমলে। সাবেক মানবাধিকার আইনজীবী স্টারমার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই গত বছর প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করা হয়; সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আল-কায়েদা ও আইএসআইএলের মতো সংগঠনের একই তালিকায় রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে। সম্প্রতি এই মাসেই আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনির বই যুক্তরাজ্যে বিক্রি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে।
মাল্ম আল জাজিরাকে বলেন, বিষয়টি হলো মতামত ও ধারণা বিনিময়ের পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত করা এবং মানুষের গায়ে অবৈধতার তকমা লাগিয়ে দেওয়া। তাঁর ভাষায়, এটি কর্তৃত্ববাদের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া, যা তাঁকে দিয়ে শুরু হয়নি এবং তাঁতেই শেষ হবে না। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কারও সঙ্গে আলোচনায় বসার কারণে তাঁকে জনস্বার্থের জন্য হুমকি বলা হলে তা ‘সংশ্লিষ্টতার দায়ে দোষী’ করার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির রিডার গ্যারেথ ডেল আল জাজিরাকে বলেন, হোম অফিসের সিদ্ধান্তে ইঙ্গিত মিলছে যে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন অব্যাহত রাখতে চায়। তাঁর ভাষায়, জলবায়ু ভাঙন ও ফিলিস্তিনে গণহত্যা — এই দুই ইস্যুতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রচারক মাল্মকে প্রবেশে বাধা দেওয়া বাকস্বাধীনতা দমনের জঘন্য প্রয়াস, যেখানে নিষেধাজ্ঞার কোনো কারণই জানানো হয়নি।



