ইইউ শিক্ষার্থীদের ফি ছাড়ে বছরে ৪৫ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত খরচে রাজি যুক্তরাজ্য, শর্ত ‘মেড ইন ইউরোপ’ প্রকল্পে প্রবেশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ফিতে ছাড় দিতে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা। তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ছাড় কেবল তখনই দেওয়া হবে, যদি ব্রাসেলস যুক্তরাজ্যকে ‘মেড ইন ইউরোপ’ শিল্প কর্মসূচিতে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউরোপ মহাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমান ফি দিতে পারবেন। এই ছাড়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় কমলে তা পূরণে সরকার শত শত মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিতে ইচ্ছুক বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রস্তাবিত ওই শিল্প প্রকল্পটি ব্লকের বাইরের দেশগুলোর ওপর বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপ করবে। তাই যুক্তরাজ্যের কাছে প্রকল্পটিতে প্রবেশ পাওয়া একটি বড় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেছেন, ফির বিষয়ে ইউরোপীয়দের দাবি মেনে নিতে যুক্তরাজ্য রাজি, তবে বিনিময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু পেতে হবে। তার ভাষায়, এখন সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো ‘মেড ইন ইউরোপ’ প্রকল্পে প্রবেশ, ফলে সেখানে একটি সমঝোতার সুযোগ রয়েছে।
সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাজ্য ইইউর সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ছে, যা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, ব্রিটিশ শিল্পকে রক্ষা করবে এবং সারা যুক্তরাজ্যের তরুণদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করবে।
রোববার সাবেক চ্যান্সেলর রাচেল রিভস প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রশংসা করে বলেন, তিনি যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ ইইউর ভেতরেই দেখেন। ট্রেজারি ছাড়ার পর প্রথম বড় বক্তব্যে তিনি বলেন, যারা ইইউ সদস্যপদে ফেরার পথ তৈরি করছেন, তাদের জনগণের কাছে জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে হবে।
আলোচকেরা কয়েক মাস ধরে একাধিক চুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ বৈঠকে চূড়ান্ত হওয়ার কথা। মন্ত্রীরা আশা করছেন, ওই বৈঠকে সমঝোতা হলে ইইউতে ব্যবসা করতে চাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো লাখ লাখ পাউন্ড মূল্যের সুবিধা পাবে।
তবে ইইউ শিক্ষার্থীদের সস্তায় পড়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি দেশের ভেতরে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ, অনেক ব্রিটিশ স্নাতক নিজেদের শিক্ষা ঋণ পরিশোধের নিয়মে পরিবর্তন চাইছেন।
ইইউ কর্মকর্তারা চান, তাদের শিক্ষার্থীরা বছরে মাত্র ৯ হাজার পাউন্ডের কিছু বেশি ফি দিক। বিপরীতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি ৬০ হাজার পাউন্ডের বেশি পর্যন্ত উঠতে পারে। এই দাবি চলতি বছরে একপর্যায়ে আলোচনা থমকে দিয়েছিল এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তারা অপ্রস্তুত হয়েছিলেন।
শীর্ষ বৈঠকের আগে নির্গমন বাণিজ্য, কৃষিপণ্য এবং যুব চলাচল প্রকল্পসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। যুব প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার তরুণ ইউরোপীয়কে কাজ, বসবাস ও পড়াশোনার জন্য ব্রিটেনে আসার অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেখানে ইইউ সদস্য দেশগুলো ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত দাবি করেছিল।
দুই পক্ষ ইউরোপীয় বায়োমেট্রিক ডাটাবেসে ব্রিটেনের প্রবেশ নিয়েও সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা আশ্রয়প্রার্থীদের শনাক্তে যুক্তরাজ্য সরকারকে সাহায্য করতে পারে বলে বলা হয়েছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাজ্যের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইউরোড্যাক ডাটাবেস, যেখানে ছয় বছর বয়স থেকে সব আশ্রয়প্রার্থীর আঙুলের ছাপ সংরক্ষিত থাকে।
খরচের হিসাব দেখেছেন এমন দুটি সূত্র জানিয়েছে, সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিস্থিতিতে — ফি দেশীয় শিক্ষার্থীদের সমান করা হলে এবং চাহিদা খুব বেশি হলে — সরকারকে বছরে ৪৫ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত দিতে হতে পারে। আরেকটি সূত্র বলেছে, প্রকৃত খরচ সম্ভবত এর চেয়ে কম হবে এবং সরকারের এক কর্মকর্তা এই অঙ্ককে অনুমানভিত্তিক বলেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় অর্থায়ন বিশ্লেষক মার্ক করভার আগে হিসাব করেছিলেন, এই নীতিতে প্রথম বছরে খাতটির খরচ হবে ১৪ কোটি পাউন্ড এবং একটি সাধারণ কোর্সের তিন বছরের মেয়াদে মোট ৪০ কোটি পাউন্ড।
ফ্রান্স আগে এই প্রকল্পে ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্তির প্রধান বিরোধী ছিল। তবে সম্প্রতি ফ্রান্স অবস্থান বদলে প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাজ্য ইইউ শুল্কের সঙ্গে গতিশীল সামঞ্জস্য মেনে নিলে ব্রিটিশ নির্মাতাদের প্রকল্পে ঢুকতে দেওয়া যেতে পারে। ব্যবসা সচিব জোনাথন রেনল্ডস সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাসেলসের চাপে তিনি শুল্ক নীতি নির্ধারণ করবেন না।



