পোশাক খাতে অস্থিরতার পেছনে কিছু মালিকও জড়িত, কঠোর দমনের হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির পেছনে কিছু শিল্পমালিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, কিছু শিল্পকারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে; এসব কারখানার মালিকদের তালিকা সরকারের কাছে দেওয়ার জন্য মালিক সংগঠনগুলোর নেতাদের বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের নামে নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের দমন করা হবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সকাল সাড়ে ৯টায় মালিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এতে শ্রমমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা শিমুল বিশ্বাসসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র ও শ্রমসচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মালিকদের বক্তব্য শোনা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মজুরি বোর্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক সংগঠন ও মালিকপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি তিন বছর অন্তর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ আগেই সরকার এ প্রক্রিয়া শুরু করে। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাম দিতে কয়েক দিন সময় নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধিদের নাম দেয়।
এরপর রবিবার শ্রমমন্ত্রী যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রজ্ঞাপন জারি করে মজুরি বোর্ড গঠন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আজই হতে পারে, অথবা অল্প সময়ের মধ্যে এর কার্যক্রম শুরু হবে। আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়সীমা রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। শ্রমিকদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মালিক ও শ্রমিক — উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তবতা পর্যালোচনা করে মজুরি নির্ধারণ করা হবে। এ নিয়ে অসন্তোষ বা সহিংসতার কোনো কারণ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সহিংসতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এসব ঘটনার পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তিনি বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে জড়িত, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, অডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার শ্রমিকবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব। দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রসার, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বৈঠকের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি জানান, সোমবার বিকেল ৩টায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হবে। সকালে মালিকপক্ষের বক্তব্য শোনা হয়েছে; বিকেলে শ্রমিক নেতাদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হবে। উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
কিছু আন্দোলনকারীর শ্রমিক পরিচয় নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তারা মনে করেন না। তার ভাষায়, প্রকৃত শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা নিজেদের কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা চাইবেন না। যারা শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায়, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি জানান, মালিক সংগঠনগুলোর নেতাদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ রাখা এবং অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত সংগঠন ও ব্যক্তিদের তালিকা দিতে বলা হয়েছে। সরকার তাদের সহযোগিতা চেয়েছে এবং মালিকপক্ষও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কোনো শ্রমিক যেন কর্মহীন না হন, কোনো শিল্পকারখানা যেন বন্ধ না হয় — সরকার সেটি নিশ্চিত করতে চায়।
মন্ত্রী বলেন, গত মাসের ১৮ তারিখে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে আগাম সতর্কতাও জানানো হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম আগে পাওয়া গেলে মজুরি বোর্ড আরও আগে গঠন করা সম্ভব হতো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আলোচনার জন্য যে সময় দেওয়া হয়েছিল, তার মাধ্যমে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ হয়েছে। এখন অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কারা রয়েছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।



