ক্যালিফোর্নিয়ায় আরও ছয়জনের বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ বিচার বিভাগের, গ্রেপ্তার পাঁচজন

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ায় আরও ছয়জনের বিরুদ্ধে কথিত ভোট জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে সোমবার এই নতুন মামলাগুলোর কথা জানানো হয়, যা রাজ্যের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানের আরও একটি ধাপ।
লস অ্যাঞ্জেলেসের শীর্ষ কেন্দ্রীয় কৌঁসুলি ও প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিল এসায়লি সোমবার ঘোষণা করেন, তাঁর দপ্তর ছয়জন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার বিরুদ্ধে মামলা করছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁরা অবৈধভাবে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন এবং জালিয়াতির ব্যালট দিয়েছেন।
ফেডারেল আদালতে দাখিল করা ফৌজদারি অভিযোগ অনুযায়ী, ছয় অভিযুক্তই গ্রিন কার্ডধারী। অর্থাৎ তাঁরা অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ মর্যাদা পেলেও তাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই।
বিচার বিভাগ গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে একই ধরনের অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। ওই সময় ৭২ বছর বয়সী এক অভিযুক্তকে ক্যামেরার সামনে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সেই দৃশ্য সম্পাদনা করে বিচার বিভাগ একটি প্রচারণামূলক ভিডিও তৈরি করে।
এসায়লি সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নতুন ছয় অভিযুক্তের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কৌঁসুলিদের ভাষ্যে, ছয় অভিযুক্তের উৎস দেশ মেক্সিকো, ইসরায়েল, ফিলিপাইন, কানাডা ও ইরান।
ছয়জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একটি করে অভিযোগ আনা হয়েছে—নাগরিকত্বের আবেদনে মিথ্যা বক্তব্য দেওয়া। হলফনামায় বলা হয়েছে, তাঁরা অবৈধভাবে ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন এবং পরে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সময় মিথ্যাভাবে দাবি করেন যে তাঁরা আগে কখনো নিবন্ধন করেননি। অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যালট দিয়েছেন, তবে জালিয়াতি করে ভোট দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি।
কৌঁসুলিদের ভাষ্যে, অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। প্রাথমিক অভিযোগগুলো লিখেছেন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের (ডিএইচএস) কর্মকর্তারা। অভিযুক্তদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়নি এবং তাঁদের কেউ আইনজীবী পেয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না। লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল পাবলিক ডিফেন্ডারের দপ্তর এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
অভিযুক্তদের একজনের বয়স ৫২ বছর এবং তিনি কানাডা থেকে এসেছেন; তিনি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুবার অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার এবং পরে নিজের নিবন্ধন বাতিলের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আরেক অভিযুক্তের বয়স ৪৩ বছর, তিনি ফিলিপাইন থেকে এসেছেন এবং ১৯৯২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন; তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সাল থেকে কয়েকবার ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নতুন গ্রেপ্তারগুলো এমন সময়ে এল, যখন বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রায় ২০ হাজার ব্যালট আলাদা করে রাখতে বাধ্য করার জন্য মামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগের দাবি, ওই ব্যালটগুলো নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের হতে পারে, যাঁরা জালিয়াতি করে নিবন্ধন করেছেন, এবং ক্যালিফোর্নিয়া নাগরিকত্বের অবস্থা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সেগুলো গোনা উচিত নয়। রাজ্যের নির্বাচন নেতারা বলেছেন, কৌঁসুলিদের তালিকা ও পদ্ধতি নির্ভরযোগ্য নয় এবং নির্বাচনের মাঝখানে এই দাবি মানা কার্যত অসম্ভব হবে ও মার্কিন নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণের ঝুঁকি তৈরি করবে। একাধিক বিচারক বিচার বিভাগের এই চেষ্টাকে অসাংবিধানিক ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের আপিল প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং ভোটার তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম উঠলে তা সাধারণত বিভ্রান্তির কারণেই হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের মাঝখানে বিচার বিভাগের এই ধরনের মামলা করা অসাধারণ ঘটনা, কারণ ফেডারেল কৌঁসুলিরা ঐতিহ্যগতভাবে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলেন, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা আসন্ন ভোটে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এসায়লি বলেন, সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তরা ফেডারেল কৌঁসুলিদের তৈরি ২০ হাজার ভোটারের তালিকায় ছিলেন, যাঁরা জালিয়াতি করে নিবন্ধিত হয়ে থাকতে পারেন, এবং এই মামলাগুলো ব্যালট গণনা বন্ধের দাবিকে আরও সমর্থন করে। তবে কেন্দ্রীয় অভিবাসন তথ্য ব্যবহার করে ভোটারদের চ্যালেঞ্জ করার ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা একটি অভিবাসী অধিকার গোষ্ঠী ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে সপ্তাহান্তে এক দাখিলে বলেছে, সম্ভাব্য জাল ভোটার হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশের বেশি রাজ্যের ভোটার তালিকাতেই পাওয়া যায়নি। ২০ হাজার নাম ক্যালিফোর্নিয়ার ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
সোমবার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এসায়লি সাংবাদিকদের বলেন, সরকার সম্ভাব্য জাল ভোটার শনাক্ত করতে ‘তৃতীয় পক্ষের ডেটাবেস’ ব্যবহার করেছে এবং তা ‘শতভাগ’ নির্ভুল নাও হতে পারে, তবে আস্থার হার ‘অনেক, অনেক বেশি’। গত মাসে প্রথম দফা গ্রেপ্তারের সময় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রেন্ট ম্যাককটার বলেছিলেন, তালিকায় এমন কিছু নাম থাকতে পারে, যাঁরা শেষ পর্যন্ত নাগরিক বলে প্রমাণিত হবেন; তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নিখুঁত নই।’
বিচার বিভাগ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জাল ব্যালট প্রক্রিয়া করা নির্বাচন কর্মকর্তাদের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করার হুমকিও বারবার দিয়েছে। শুক্রবার এক ফেডারেল বিচারক এর তিরস্কার করেন এবং প্রশাসনকে নির্বাচন কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া চালিয়ে যেতে বাধা দেন। এদিকে এসায়লি ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও গত সপ্তাহে এক ফেডারেল বিচারক রায় দিয়েছেন যে তিনি মার্কিন অ্যাটর্নি দপ্তরের প্রধান হিসেবে ‘বেআইনিভাবে’ দায়িত্ব পালন করছেন, কারণ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি ও সিনেটে নিশ্চিত করা হয়নি; বিচার বিভাগ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করছে।




