বান্দরবানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২২৩ পদের মধ্যে শূন্য ১৫০টি, চলছে মাত্র ৭৩ শিক্ষকে

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এমনিতেই শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। তার ওপর জেলার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট দেখা দিয়েছে।
জেলার সাতটি উপজেলার আটটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ২২৩টি। এসব পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৩ জন শিক্ষক। শূন্য রয়েছে ১৫০টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান।
এসব বিদ্যালয়ে পড়ছে ৭ হাজার ৫৫৬ জন শিক্ষার্থী। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান, নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যক্রম শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ চালানোর জন্যও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে এবং পাঠদানের গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিদ্যালয়ে সংকট সবচেয়ে প্রকট। বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে অনুমোদিত ৫২টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ২৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রধান শিক্ষকসহ কর্মরত আছেন মাত্র চারজন।
এ ছাড়া আলীকদম সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ১৭টি পদের বিপরীতে চারজন, রুমা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ১৫টি পদের বিপরীতে পাঁচজন, থানচি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ১৫টি পদের বিপরীতে ছয়জন, লামা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ২৭টি পদের বিপরীতে নয়জন এবং নাইক্ষ্যংছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ১৬টি পদের বিপরীতে চারজন শিক্ষক কর্মরত আছেন।
অভিভাবক মংচিং নুং মার্মা বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট অনেক আগে থেকেই রয়েছে। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় অনেকে সে সুযোগ পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তাদের মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে হচ্ছে।
বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ উদ্দীন বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে, কিন্তু কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এভাবে বিদ্যালয়টি ধুঁকে ধুঁকে চলছে বলে তিনি জানান।
আলীকদম সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তার বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট প্রকট। দীর্ঘদিন মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পর আরও একজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চারজন শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
কয়েকজন সহকারী শিক্ষক জানান, প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় কর্মরতদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। গণিত ও বিজ্ঞানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি তৈরি হয়। তারা আরও জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষকদের আবাসন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ এসব সুবিধার অভাবে পদায়ন ও দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষকদের কর্মস্থলে ধরে রাখায় সমস্যা হচ্ছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকের সংকট বেশি। জেলার বিদ্যালয়গুলোর শূন্য পদের তালিকা তৈরি করে ইতোমধ্যে বিভাগীয় প্রধানের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষকসংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের জানা আছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে আগামী এক মাসের মধ্যে একদল শিক্ষক পদায়ন করা হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শূন্য পদ পূরণের চেষ্টা করবে সরকার।




