অধ্যক্ষকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা শিক্ষার্থীদের, মাউশির প্রজ্ঞাপন না এলে ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকাল বন্ধের ঘোষণা

রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন নেছাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন কলেজটির শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে মধ্যরাতে পুলিশের হামলার অভিযোগের তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন তাঁরা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা দেন। এর আগে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির সামনের সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় নীলক্ষেত মোড় থেকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা দুই দফা দাবি তুলে ধরেন। প্রথম দাবিতে বলা হয়, মধ্যরাতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয় দাবিতে শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজের সব শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন নেছাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব প্রশাসনিক কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, দাবি আদায় না হলে পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। প্রশাসন থেকে কোনো আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা।
অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দিনের আন্দোলন। শুক্রবার সকাল ৯টার পর থেকে শিক্ষার্থীরা কলেজের ভেতরে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। পরে নির্ধারিত একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষা চলার কারণে পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে কলেজের সামনের দুই পাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী সীমা আক্তার বলেন, দুই দফা দাবির বিষয়ে শিক্ষার্থীরা অনড় আছেন; ৭২ ঘণ্টা কেন, যতক্ষণ দাবি মানা না হবে ততক্ষণ তাঁরা থাকবেন। শুক্রবার ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় আন্দোলনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে শনিবার থেকে ক্যাম্পাস খুললে আরও অনেকে যোগ দেবেন বলে তিনি জানান।
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় আবাসিক হলের দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজের অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়।
নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিল করেন অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকে অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তাঁরা অধ্যক্ষকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষকে উদ্ধারের সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা করে এবং এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। সীমা আক্তার বলেন, লাঠির আঘাতে তিন থেকে চারজন হাসপাতালে আছেন, অনেকের গায়ে লাঠির আঘাত লেগেছে; চুল ধরে টেনে নামানো এবং হাত ধরে টেনেহিঁচড়ে নামানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি শিক্ষার্থীদের কাছে আছে বলেও তিনি জানান। আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে হাতুড়িপেটা এবং এক নারী শিক্ষার্থীর চুল ও হিজাব ধরে টানাটানির অভিযোগও করেছেন।
অন্যদিকে অধ্যক্ষ বলেছেন, শিক্ষার্থীরা যা বলছে তা পুরোপুরি ঘটনার বিপরীত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিয়েছিলেন রাত ১২টা পর্যন্ত, কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছেন।
লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামিল হোসেন বলেন, কিছু শিক্ষার্থী কলেজের সামনের সড়ক আটকে রেখেছেন; তবে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করলে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। গত রাতের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অধ্যক্ষকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশকে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল, তবে এ সময় কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।




