জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হলে বিপ্লব বারবার ফিরে আসবে: মগবাজারে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশে বিপ্লব বারবার ফিরে আসবে। যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের পরিণতি ৭ নভেম্বরের মতোই হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজার আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের আয়োজনে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহিরা কেন বিদ্রোহ করেছিলেন, তার পেছনে অনেক কারণ ছিল। ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। শেখ মুজিব নির্বাচনের আগে বারবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কাজ করবে না। অথচ ক্ষমতায় এসে ইসলামী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হলো।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘এক নেতার এক দেশ’ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।
তৎকালীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট করে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। জনগণের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণসামগ্রীও যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষ কম্বল পায়নি। এ নিয়ে শেখ মুজিব নিজেও একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বিভিন্ন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের নেতারা সোনার খনি পেয়েছেন, আর তিনি পেয়েছেন চোরের খনি।
৭ নভেম্বরের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান এবং তাঁদের উপেক্ষা করার কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মূলত সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতেই সেদিনের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। এতে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা শুরুতে ছিল না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে দেশে ক্ষমতার নানা পালাবদল ও অস্থিরতা তৈরি হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়। পরবর্তী সময়ে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দেন। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। ওই সময়ে তাঁর নিজের কোনো ভূমিকা ছিল না, সিপাহিরাই তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, ভোররাতে সিপাহিরা ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে রাস্তায় নামেন। তখন মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়া মানুষ তাকবির দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানান এবং ফুল ছিটিয়ে দেন। ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে জনতার ঢল নামে। বিপ্লবটি সিপাহিরা করেছিলেন, কিন্তু জনগণ তাতে সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছিল। এ কারণেই দিবসটির নাম হয়েছে বিপ্লব ও সংহতি দিবস।
জামায়াতের আমির বলেন, ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বিএনপি গঠন করেন। তবে ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে আলাদা করে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাগুলো ঘটেছিল দুঃশাসন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে। মানুষ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিল। তারা নিজেদের অধিকার, কথা বলার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার, চাকরির অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং নারী-পুরুষের নাগরিক অধিকার চেয়েছিল।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালেও দেশে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। বিএনপির নেতা বিচারপতি সাত্তার জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনগণ আশা করেছিল, তিনি গণতন্ত্রের পাহারাদার হবেন। কিন্তু তৎকালীন সরকারের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও নানা সীমাবদ্ধতায় সমাজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
জামায়াত আমির বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধানের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন। অনেকেই বলেন, বন্দুকের নলের মুখে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর উচিত ছিল জনগণের ম্যান্ডেটের কথা উল্লেখ করে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা। জনগণ তাঁকে যে দায়িত্ব দিয়েছিল, সেই আমানত তিনি রক্ষা করতে পারেননি।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁর বিদায়ও স্বাভাবিক ছিল না। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁর সঙ্গে যারা ছিলেন, সেদিন গুলিতে তাঁদের শরীর ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব বিষয় নিয়ে তখন অনেক বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে নেগোসিয়েশন ও ফ্লেক্সিবিলিটি। এই দুটি বিষয় যখন রাজনীতিতে থাকে না, তখন রাজনীতি কঠিন হয়ে যায় এবং তা আর জনগণের রাজনীতি থাকে না।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



