বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ৫১ বছর: ৭ নভেম্বরের সিপাই-জনতার অভ্যুত্থান

আজ ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের মানুষ দিনটিকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচিত হয়েছিল, আর আজ সেই ঘটনার ৫১ বছর পূর্ণ হলো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী চার বছরে ভুল শাসননীতি, দুঃশাসন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার অশুভ আঁতাতের কারণে দেশ গভীর সংকটে নিপতিত হয়। আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, লুটপাট, দুর্নীতি, নির্যাতন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় অগণতান্ত্রিক বাকশালী শাসন, দলীয় পেটোয়া ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে শাসক ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক মানবাধিকার হরণ করা হয়। এসবই সিপাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে একটি আধিপত্যবাদী শক্তি চায়নি বাংলাদেশ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাই সেনাবাহিনীকে দুর্বল রেখে শক্তিশালী প্যারা মিলিটারি ফোর্স রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি উচ্চাভিলাষী ও বিভ্রান্তিকর সেনা অভ্যুত্থান ঘটে।
তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সৎ, নীতিবান, পেশাদার এবং জনপ্রিয় সেনা কর্মকর্তা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করলে তা দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে। তাই তিনি চক্রান্তকারীদের অসাংবিধানিক পদক্ষেপে সায় না দেওয়ায় তাঁকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয়।
সাংবাদিক ও গবেষক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর আলোচিত 'বাংলাদেশ: এ লিগেছি অব ব্লাড' গ্রন্থে তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান কোনো জনমুখী অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক পদক্ষেপ, যা সাধারণ সৈনিকদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, কারণ তারা তাঁকে জাতীয় সম্মান ও সামরিক সততার প্রতীক মনে করত।
৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা সাধারণ সিপাই এবং দেশপ্রেমিক জনগণের মধ্যে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয় যে এদেশকে আবারও বিদেশি আধিপত্যবাদের কলোনিতে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে।
৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে। সিপাইরা 'নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার' এবং 'সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই' স্লোগানে রাজপথ ও ব্যারাক মুখরিত করে তোলেন। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সাধারণ সিপাইরা তাদের প্রিয় জেনারেলকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন।
মুক্ত হয়ে তিনি যখন সেনানিবাসে বের হয়ে আসেন, তখন হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক তাঁকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়েন। সেনানিবাসের সিপাইদের বিপ্লবের খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকা শহরে। সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসেন। সিপাই ও জনতা একে অপরকে কোলাকুলি করেন, ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং আধিপত্যবাদ-বিরোধী স্লোগান দেন। ইতিহাসে সিপাই-জনতার এমন রক্তপাতহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের নজির বিরল।
সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ। তাঁর 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, বিপ্লবী সেপাইরা বিভিন্ন ইউনিট থেকে বেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জিয়ার বাসভবনের চারপাশে সমবেত হতে থাকে। সবারই লক্ষ্যস্থল ছিল জিয়ার বাসভবন। সবাই সেখানে একত্র হয়ে দুর্গ ভেঙে বন্দী জিয়াকে বের করে আনবেন, এই ছিল পরিকল্পনা।
দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর 'বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভুলেশন' গ্রন্থে সে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ৭ নভেম্বরের ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার সৈনিক এবং বেসামরিক জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। ট্যাংকগুলো জনগণকে দমন করতে বের হয়নি, বরং সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফুল দিয়ে সজ্জিত হয়ে রাজপথে নেমেছিল।
৭ নভেম্বর শুধু একজন ব্যক্তির মুক্তির দিন ছিল না। দিনটি ছিল বাংলাদেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেভাবে প্রতিবেশী দেশের অনুকম্পা ও আধিপত্য চেপে বসেছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সেই শৃঙ্খলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
৭ নভেম্বরের সিপাই-জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে এক ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্বের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। তিনি প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংহতি রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্বাসনের স্বার্থে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সামরিক পোশাকের আড়ালে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে একটি টেকসই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য। তাই তিনি দ্রুত দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর 'বাংলাদেশ পলিটিকস: প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুস' গ্রন্থে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন সামরিক শাসনজনিত বৈধতা ক্ষণস্থায়ী। গণভোট আয়োজন, স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা এবং অবশেষে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি তাঁর শাসনকে বেসামরিকীকরণ করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এ বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়, তার মূর্ত রূপ হলো 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি)। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি ছিল ৭ নভেম্বরের সিপাই বিপ্লবের চেতনাসম্ভূত এক বিরাট জাতীয় ঐক্যমঞ্চ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণে গঠিত এ ভূখণ্ডের মানুষের আসল পরিচয় হলো 'বাংলাদেশি'।
৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের শাসনভার লাভ করেছিলেন, সেটা ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি নামে আখ্যায়িত এক অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্র। কিন্তু তাঁর কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে শুরু করে। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে 'খাল কাটা কর্মসূচি' পরিচালনা করেন এবং এদেশের কৃষককে উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর আমলেই বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতি পূরণ করে বিদেশে চাল রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে তিনি শীর্ষে নিয়ে যান। ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-তে তিনি ওআইসি আল-কুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন, তার ফলেই পরবর্তীতে গঠন করা হয় 'সার্ক'। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়, যা ছিল জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক সাফল্যের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

