গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ল, প্রতি ইউনিয়নে নিয়োগ পাবেন দুজন নারী
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশে ৪০ হাজারের বেশি গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা ও সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর থেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানের বর্তমান বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
মাসিক বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি অবসরকালীন আনুতোষিক ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। গ্রাম পুলিশের জন্য আনুতোষিক ভাতা ৭০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের আনুতোষিক ভাতা ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
তথ্য দেওয়া-নেওয়ার জন্য গ্রাম পুলিশকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে হয়। এ কারণে সরকার প্রতিজন গ্রাম পুলিশ সদস্যকে মোবাইল ফোনের খরচের জন্য মাসিক ২০০ টাকা করে দেবে। থানায় প্রতি সপ্তাহে হাজিরার জন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ৩০০ টাকা পেয়ে থাকেন। বর্তমান সরকার থানায় যাতায়াত ভাড়া প্রতি সপ্তাহে আরও ২০০ টাকা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। গ্রাম পুলিশ প্রধানের থানায় যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুনভাবে আরও ২ জন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ করা হবে। নারী পুলিশদের ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হবে। তিনি জানান, সরকার ইতিমধ্যেই সারাদেশে ১ লাখ হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে ৮০ হাজার হবেন নারী হেলথ ওয়ার্কার।
গ্রাম পুলিশের কার্যক্রমের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ রাস্তা ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ নামে নামকরণ করা হবে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের আওতায় এনে ‘গ্রাম পুলিশ সড়কে’ বৃক্ষরোপণ করা হবে। গাছ পরিণত হলে ওইসব গাছ বিক্রি করে পাওয়া অর্থ ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়নি; রাষ্ট্র ও সমাজে চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়ও ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে হীন স্বার্থ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে বাংলাদেশের আবহমানকালের বিরাজমান সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহমর্মিতার মূল্যবোধকেও বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখতে পরিবারে-পরিবারে পর্যন্ত বিরোধ বিবাদ উসকে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলেও প্রতিশোধ প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই পরিস্থিতির উন্নয়ন একমাত্র উপায় বলে তিনি মনে করেন না। বরং, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় কার্যক্রমের পাশাপাশি ধর্মীয়-সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, এবং মানুষে মানুষে সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অন্যতম একটি কার্যকর উপায়। সমাজে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত হলে সামাজিক অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে গ্রাম পুলিশের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, সব ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা হতে হবে আইনসম্মত, মানবিক, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব।
তিনি বলেন, একটি নিরাপদ ইউনিয়ন বা গ্রামের জন্য কার্যকর স্থানীয় প্রশাসন, দায়িত্বশীল গ্রাম পুলিশ এবং সচেতন জনগণের সক্রিয়তা — এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয় জরুরি। এই সমন্বয় যত কার্যকর এবং শক্তিশালী হবে, দেশের ইউনিয়ন কিংবা গ্রামগুলোও তত বেশি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতেও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাদের কাজগুলো হয়তো সবসময় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। তবে মনে রাখতে হবে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের একটি বিচক্ষণ এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবার পরিজন নিয়ে যাতে কিছুটা সচ্ছল জীবন পরিচালনা করতে পারেন, ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে একটু হলেও যাতে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, সেদিকেও সরকারের নজর রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং ঘোষণা কার্যকরও করা হয়েছিল।
তারেক রহমান বলেন, “আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর থেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ইনশাআল্লাহ।” বেতন-ভাতা ছাড়াও গ্রাম পুলিশের জন্য আরও কয়েকটি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।



