…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আন্তর্জাতিক › খবর
আন্তর্জাতিক

তাইজের বাজারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু হতাহত, অবরুদ্ধ শহরে মানবিক বিপর্যয় ঘনীভূত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের একটি বাজারে শুক্রবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। যুদ্ধের দুই পক্ষই এ হামলার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে চলমান যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, আর মানবিক সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর এক মাস পূর্ণ হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি এই অভিযান শুরু করেন। এর লক্ষ্য ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং রাজধানী সানা মুক্ত করা, যা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তা এবং সরকারি সামরিক জোট ও ইউনিটগুলোর স্থল অভিযানের ওপর ভর করে এই অভিযান চলছে। লোহিত সাগর করিডরে হুতিদের সামুদ্রিক অবরোধ ভেঙে বাব আল-মান্দেব প্রণালি নিরাপদ করা একটি অপরিহার্য লক্ষ্য। গত সেপ্টেম্বরে হুতিরা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করার পর এই লক্ষ্য আরও জরুরি হয়ে ওঠে।

অভিযান শুরুর দিনই সরকার জানিয়েছিল, তাদের বাহিনী ধুবাব ও বাব আল-মান্দেবের আশপাশের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। তবে এসব অর্জনের পরিধি নিশ্চিত করা যায়নি। তারা হাইফান, পশ্চিম তাইজ ও আল-ওয়াজিয়ার আশপাশের পাহাড়ি অবস্থানগুলোও দখলের কথা জানায়। ১৩ অক্টোবরের মধ্যে লড়াই মারিবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সরকারি বাহিনী মাস ক্যাম্পের আশপাশে ও হারিবের উত্তরে অগ্রগতির দাবি করে।

তবে তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনী এলাকা হারায়, যার ফলে হুতিদের অবরোধ শহরটিকে চেপে ধরেছে। অবরোধের প্রথম মাস পূর্ণ হতে চলেছে। শুক্রবার সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রদেশটিতে অনেক এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তাইজ প্রদেশের আল-নিদানি গ্রাম, শাব আল-সারারি, সানামাত এলাকার বড় অংশ এবং ধি আল-বারহের রিবাত আল-কার্ন এলাকা।

সরকারি সেনা ও জোটের যোদ্ধারা আল-আকরুদ ফ্রন্টের তাভাত ওয়াথিব ও হাবিল আল-সারাম পাহাড়ও নিরাপদ করেছে। তারা জানিয়েছে, বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে হুতি অবস্থানগুলোর বিরুদ্ধে ১ হাজার ২১১টি অভিযান চালানো হয়েছে। লাহিজ প্রদেশের তুর আল-বাহাহ ফ্রন্টে নতুন অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও তারা নিশ্চিত করেছে।

তবে যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক টমাস বনি জেমস বলেন, সরকারি বাহিনী ইয়েমেনের রাজধানী সানা ফিরে পাওয়ার কাছাকাছিও নেই। তিনি বলেন, ‘সানা ফিরিয়ে নেওয়া এবং হুতি শাসনের অবসান ঘটানো—এটা শিগগিরই হবে না। কাগজে সরকারি বাহিনীকে বড় মনে হলেও তারা অনেকগুলো ফ্রন্টে ছড়িয়ে আছে এবং পুরোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করে। সানা পাহাড় দিয়ে ঘেরা, ফলে এটি রক্ষা করা সহজ। ২০১৫ সাল থেকে অনেক শক্তিশালী সৌদি-আমিরাতি জোট চেষ্টা করেও কাছাকাছি যেতে পারেনি।’

জেমস বলেন, ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানকে সম্পূর্ণ বিজয়ের চেষ্টা হিসেবে নয়, চাপ প্রয়োগের উপায় হিসেবে বোঝা ভালো। তার ভাষায়, ‘এর লক্ষ্য হুতিদের জন্য যুদ্ধকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলা এবং কোনো শান্তিচুক্তির আগে সৌদি আরবকে শক্তিশালী অবস্থান দেওয়া। পরের তিন মাসে যা ঘটবে, তা স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছে, ‘ডন অব ইয়েমেন’ শুরু হওয়ার পর থেকে সশস্ত্র বাহিনী ৪০ হাজার ৭৬১টি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কাউন্সিল আরও জানিয়েছে, এসব হামলায় প্রায় ২০ হাজার হুতি নেতা ও সদস্যকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে এবং ৫ হাজারের বেশি যানবাহন ধ্বংস হয়েছে। এর আগে সামরিক কমান্ডের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, প্রথম কয়েক সপ্তাহে ১৭ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। পুরো মাস জুড়ে দৈনিক ৯৫১ থেকে ১ হাজার ২৭২টি অভিযানের হিসাব দেওয়া হয়েছিল। গত মাসে সরকার আরও জানায়, তাদের বাহিনী ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৪০ জন হুতিকে হত্যা বা আহত করতে পেরেছে। গত সপ্তাহে সরকার জানায়, ৫ অক্টোবর থেকে ১৬ হাজার ১০০ হুতি কর্মী ও কমান্ডার নিহত বা আহত হয়েছে। তবে আল জাজিরা জানিয়েছে, তারা এসব সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।

হুতিরা বলেছে, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত তাদের ওপর মোট ৩ হাজার ৯৩০টি বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হুতিরা, যারা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে শত শত হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক মারাত্মক হামলাগুলোর একটিতে শাবওয়াহে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৭০ জন নতুন সদস্য নিহত হয়।

শুক্রবার তাইজ প্রদেশের আল-হাদারা বাজারে হামলার জন্য ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের দায়ী করেছে। ওই হামলায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। সরকারের সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, ‘সন্ত্রাসী’ হুতিরা বাজারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তিনি এটিকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করেন। ইরান সমর্থিত হুতিরা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, ইয়েমেন সরকারের পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরবই এই হামলার জন্য দায়ী।

২০১৪ সালে রাজধানী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের পর থেকে হুতিদের হাতে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর একসময়ের বিপুল অস্ত্রভান্ডার রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বাইরের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে। তাদের ক্রমবর্ধমান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সৌদি আরবের অনেক এলাকায় এবং গত জুনে ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

লড়াই চলতে থাকায় ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) শুক্রবার জানিয়েছে, আগস্টে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে ৩ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এদের মধ্যে তাইজ প্রদেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের পাঁচজনের মধ্যে দুজনই তাইজে রয়েছেন। সেখানে হুতিদের অবরোধ শহরটিকে ঘিরে রেখেছে এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষকে সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, আগস্ট থেকে ২৮১ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জন নিহত ও ২১২ জন আহত। হতাহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি।

তাইজের অবরোধ বিষয়ক দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সালাহ আহমেদ গালেব আল-মাজিদি পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হুতিদের অবরোধের কারণে ওষুধ, খাবার, জ্বালানি ও পানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রদেশটিতে পৌঁছাতে পারছে না। শহরের অবশিষ্ট ডিজেল মজুত কমে গেছে, আর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় চলবে।

তাইজের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-গভর্নর ইলান আবদুল হাও জানান, প্রায় ৪০ শতাংশ হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো এখনও খোলা আছে, জ্বালানির অভাবে সেগুলো ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। তিনি সতর্ক করেছেন, জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে জরুরি সেবাসহ হাসপাতালের বিভাগ ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। জেমস বলেন, ইয়েমেনে শীত এগিয়ে আসছে, আর তাইজের ওপর অবরোধ আরও শক্ত হচ্ছে। তাই সাধারণ ইয়েমেনিদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

যুদ্ধ ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হুতিরা সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। জেমস বলেন, ‘হুতিরা প্রায় প্রতিদিন সৌদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরব আবার প্রকাশ্যে ইয়েমেনের ভেতরে বোমা ফেলছে। দুই পক্ষই যেখানে ব্যথা লাগে সেখানেই আঘাত করছে, আর এভাবেই যুদ্ধ বড় হয়।’ অঞ্চলের অন্য লড়াইও ইয়েমেনকে আরও বড় যুদ্ধে টেনে নিতে পারে, আবার উল্টোটাও হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ অচলাবস্থায় রয়েছে। জেমস বলেন, ‘ইয়েমেন এখন ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা চালালে ইরান চাইবে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াতে হুতিদের ব্যবহার করতে।’

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরও খবর

আন্তর্জাতিক

অভিশংসনের পর আটক প্যারাগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট পেনিয়া হাজির হলেন কৌঁসুলিদের সামনে

অভিশংসনের পর আটক প্যারাগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া কৌঁসুলিদের সামনে হাজির হয়েছেন। একটি ডিজিটাল ব্যাংক ধসের সঙ্গে জড়িত অনিয়মের অভিয…

ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট
আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ দেশটির নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন গাদি আইজেনকটকে। আইজেনকট ইয়াশার দলের নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন …

আন্তর্জাতিক

নাজিবকে গৃহবন্দির আদেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা রাজার আদেশ অমান্যের শামিল: মালয়েশিয়ার রাজা

মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সতর্ক করে বলেছেন, কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে গৃহবন্দি রাখার বিষয়ে তাঁর দেওয়া আদেশকে চ্যালেঞ্জ করা…

আন্তর্জাতিক

রাষ্ট্রের নির্দেশ পেলেই পারমাণবিক নীতি বদলাতে প্রস্তুত আইআরজিসি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রীয় নীতিনি…