তিন বছরের ব্যবধানে দুই মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরি, অবিস্মরণীয় ৭ নভেম্বর
৯১/৭ থেকে ২৯৩/৭ এবং ১৮৪/৭ থেকে ৩৮৬/৯ — দুটি স্কোরই ইঙ্গিত দিচ্ছে এক অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের। দল যখন বিপদে, খাদের কিনারায়, তখন কোনো ব্যাটারের অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়েই এমন স্কোর সম্ভব হয়।
ঠিক তাই হয়েছে, সময়ের হিসাবে দুটি স্কোরের ব্যবধান ঠিক তিন বছর। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল খেলেছিলেন সম্ভবত এই ফরম্যাটের সেরা ইনিংস।
ম্যাক্সওয়েল যখন ক্রিজে নামেন, নবম ওভারে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৪ উইকেটে ৪৯। আরও ১০ ওভার পর স্কোর দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ৯১।
তখন ম্যাক্সওয়েল ২৬ বলে ২২ রানে অপরাজিত। সেখান থেকে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে তুলে দিলেন সেমিফাইনালে। প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে পুরুষ ওয়ানডেতে ১২৮ বলে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন তিনি; ওয়ানডেতে রান তাড়া করতে নেমে এটিই প্রথম দ্বিশতক।
শুধু সংখ্যা দিয়ে ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসকে ছোট করা হবে। ব্যাটিংয়ের সময় ক্র্যাম্পে ভুগছিলেন তিনি; একবার দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাটিতে পড়েই গেলেন। তারপর পায়ের কোনো মুভমেন্ট না করেই পরের ৫৪ রান তুলে নেন ২৯ বলে।
প্যাট কামিন্সের সঙ্গে ২০২ রানের জুটিতে তাঁরই অবদান ছিল ১৭৯ রান। ৪৭তম ওভারে মুজিব উর রহমানকে দুটি ছয় ও একটি চার মারেন তিনি। জয়ের জন্য ও ডাবল সেঞ্চুরির জন্য পাঁচ রান প্রয়োজন ছিল; মিডউইকেট দিয়ে ছক্কা মেরে দুটোই পূরণ করেন।
সেই দিনটিকেই যেন মনে করিয়ে দিলেন বাংলাদেশের তাওহীদ হৃদয়। ক্যারিয়ারের মাত্র চতুর্থ টেস্ট খেলতে নেমে অভিজ্ঞ ব্যাটারদের ব্যাটিং শেখালেন তিনি।
সিলেট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২২ রানে ২ উইকেট পড়ার পর মাঠে নামেন হৃদয়। অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে তাঁর ৭৩ রানের জুটি ভাঙতেই ধস নামে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে। লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজদের ব্যর্থতার পর স্কোর দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ১৭৪।
প্রথম ইনিংসে ৩৫৬ রান করা উইন্ডিজ তখন বড় লিডের স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু তাদের চিন্তাধারা ঘুরিয়ে দিলেন হৃদয়। সাদমান ইসলামের ইনজুরিতে ১০ জন নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশকে লিড এনে দিলেন তিনি একের পর এক রেকর্ড ভেঙে।
অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ১৬৭ বলে ১১৭ রানের জুটি গড়েন হৃদয়, যাতে তিনি একাই করেন ৯২ রান। ততক্ষণে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক ছুঁয়ে দেড়শ পার করেছেন।
এই জুটি ভাঙার পর তাসকিন ব্যাটিং প্রান্তে আসেন। হৃদয়কে দারুণ সঙ্গ দেন তিনি। একপ্রান্ত ধরে রেখে হৃদয় চার-ছক্কায় গ্যালারি মাতান। ৩০৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি করে মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পাশে নাম লেখালেন হৃদয়।
তারপর চার-ছক্কা মেরে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসও খেলে ফেলেন হৃদয়। মুশফিকের ২১৯ রান পেছনে পড়ে যায়। হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংস থামে তাসকিনের বিদায়ে; ১২১ বলে ৮৫ রানের জুটি ভেঙে যায়।
যৌথভাবে এক ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ ছক্কা মেরে ২৪২ রানে অপরাজিত ছিলেন হৃদয়। ৩৫৯ বলের ইনিংসে ছিল ২২টি চার।
একদিকে খাদের কিনারা থেকে দলকে জিতিয়ে ম্যাক্সওয়েলের অপরাজিত ২০১ রানের ইনিংস। আরেকদিকে হৃদয়ের দলকে ৩০ রানের লিড এনে দেওয়া রেকর্ড গড়া ইনিংস। কোনটিকে এগিয়ে রাখবেন, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। কিন্তু ঠিক তিন বছরের ব্যবধানে এই দুটি লড়াকু ডাবল সেঞ্চুরির কারণে ৭ নভেম্বর ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় যে অক্ষয় হয়ে থাকবে, তা নিশ্চিন্তে বলা যায়।




