শামীম হত্যাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে আদালতে জবানবন্দি দিলেন প্রধান আসামি আমিনী
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ বা দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী। রবিবার সন্ধ্যায় জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় তিনি এই জবানবন্দি দেন।
রবিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক নুসরাত জাহানের খাস কামরায় জবানবন্দি শুরু হয়; শেষ হয় রাত সাড়ে নয়টার দিকে। গ্রেপ্তার ফজলুল হক দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। তিনি ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক আল আমিন বলেন, রবিবার সন্ধ্যা সাতটায় আমিনীকে বিচারক নুসরত জাহানের খাস কামরায় হাজির করা হয়। সেখানে তিনি নিজেকে শামীম হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
আদালতের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, জবানবন্দিতে আমিনী উল্লেখ করেন, শামীম নাস্তিক ছিল; তাঁকে মারার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না, ঘটনাটি ‘অ্যাক্সিডেন্টলি’ হয়ে গেছে। আপাতত আইনের দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী হলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে তিনি কী, সেটা আল্লাহ ভালো জানেন। এ সময় তিনি হত্যাকাণ্ডে কারা কারা জড়িত, তাঁদের নামও প্রকাশ করেন।
জবানবন্দি শেষে রবিবার রাত নয়টার পর আমিনীকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক নাজমুল হক।
এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন)-৬-এর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। রবিবার দুপুরে তাঁকে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়; সন্ধ্যায় পাঠানো হয় আদালতে।
আমিনী যাঁর বাড়িতে ছিলেন, সেই বসির আহমেদ জানান, আমিনী তাঁর চাচাতো ভাই; তাঁর জন্ম ফরিদপুর গ্রামে। ২৮ বছর আগে তাঁর চাচা ক্বারী রুহুল আমিন সপরিবারে দেবহাটার দক্ষিণ পারুলিয়ায় বসবাস শুরু করেন। শামীমকে হত্যার পর আমিনী তাঁর বাড়িতে চলে আসেন। শনিবার রাত ১০টার দিকে আদালতে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে পরামর্শ করেন তিনি। বসির তাঁকে স্থানীয় বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এরই মধ্যে রাত সাড়ে ১০টার দিকে এসআরবি তাঁর বাড়িতে আসে; জিজ্ঞাসা করতেই তিনি আমিনীর অবস্থান নিশ্চিত করেন। রাত ১১টার দিকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গত মঙ্গলবার দেবহাটায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
নিহতের পরিবার জানায়, শামীম দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার তাঁর ও স্ত্রীর বাগ্বিতণ্ডার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে তিনি বিষপান করেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা চলাকালে পরদিন শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করেন। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক লোক ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবার মারধর করেন; আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মীরা তাঁদের থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি; পুলিশ চাইলে ফুটেজ দেওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। এতে আমিনীকে (৪৫) প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত শুক্রবার ভোরে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, ফজলুল হক আমিনী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রধান আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসা নামগুলো যাচাই করে বাকি জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।



