রাজশাহীতে ৪৫ ফুটের দুর্গা আর ১০ হাজার চকলেটের প্রতিমা ঘিরে উৎসবের আমেজ
রাজশাহীতে এবারের দুর্গাপূজায় দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে দুটি ব্যতিক্রমী প্রতিমা — টাইগার সংঘের ৪৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা এবং তাহেরপুরে ১০ হাজার পিস কয়েন চকলেট দিয়ে তৈরি অনন্য এক প্রতিমা। দুটি আয়োজন ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে, আর মণ্ডপগুলোতে বেড়েছে উৎসুক মানুষের ভিড়।
রাজশাহী নগরীর টাইগার সংঘ তাদের ৪৫তম বছরে নির্মাণ করেছে ৪৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা। অন্য প্রতিমাগুলো স্বাভাবিক আকারে রাখা হলেও মণ্ডপের ওপরে থাকা দুর্গাপ্রতিমায় আনা হয়েছে বিশেষত্ব। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, ফলে প্রতিমাটি দেখতে দর্শনার্থীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
টাইগার সংঘের সাধারণ সম্পাদক পার্থ পাল চৌধুরী বলেন, রাজশাহী সম্প্রীতির শহর। এখানে সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মকে সমান মর্যাদা দেন। অতীতে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে বাগমারা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুর শ্রী শ্রী গঙ্গা মাতা মন্দিরে তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ অনন্যধর্মী এক প্রতিমা, যা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১০ হাজার পিস গোল্ডেন কয়েন চকলেট। স্বর্ণালি কয়েন চকলেটের নিখুঁত প্রলেপে তৈরি এই প্রতিমার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মণ্ডপজুড়ে উৎসুক মানুষের আগমন ঘটছে।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠন নবজাগরণ সংঘের সার্বিক আয়োজনে এই প্রতিমাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আয়োজকরা জানান, প্রতি বছরই পূজায় দর্শনার্থীদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা থাকে তাঁদের। সেই ধারাবাহিকতায় এবার চকলেট দিয়ে বৈচিত্র্যময় প্রতিমা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। প্রতিমাটি তৈরিতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই চকলেট প্রতিমার মূল কারিগর নাটোরের প্রখ্যাত প্রতিমাশিল্পী নীল কুমার দাস। তিনি অত্যন্ত নিপুণ হাতে ও সুচারুভাবে ১০ হাজার পিস কয়েন চকলেট দিয়ে মা দুর্গা এবং তাঁর সন্তানদের অনন্য রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। সৃজনশীলতা আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের এমন মেলবন্ধনে তাহেরপুরের এই পূজামণ্ডপটি পুরো রাজশাহী অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
তাহেরপুর শ্রী শ্রী গঙ্গা মাতা মন্দির কমিটির সভাপতি শিবেন হালদার এবং সাধারণ সম্পাদক দিজেন হালদার উৎসবমুখর পরিবেশ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, এবারের চকলেট প্রতিমাটি এলাকার পূজার আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে পূজা উপভোগ করার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটকে এবং গমন নৌকায়। শঙ্খধ্বনি, ঢাক-কাঁসরের বাদ্য আর পুরোহিতদের পূজা-অর্চনায় মুখর হয়ে উঠেছে রাজশাহীর মণ্ডপগুলো। উৎসবের এই আবহ শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
পূজার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার সাহা। তিনি জানান, নবমীর দিন যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহী ধর্মসভা পরিদর্শনে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এবার পূজামণ্ডপগুলোতে সর্বোচ্চ পরিমাণ সরকারি অনুদান দেওয়া হয়েছে এবং পুরোহিতেরা নিয়মিত মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। এই মানবিক সহযোগিতার জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
এবার রাজশাহী মহানগরীতে ৮৫টি এবং জেলার আটটি উপজেলায় ৩৮১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। সব মিলিয়ে রাজশাহী জেলায় এবার ৪৬৬টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে বাগমারায় সর্বোচ্চ ৮৬টি মণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া তানোর ও বাঘায় ৫৯টি করে, পুঠিয়ায় ৫৬টি, গোদাগাড়ী ও চারঘাটে ৪২টি করে, মোহনপুরে ২৪টি এবং দুর্গাপুরে ২৩টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
এতগুলো মণ্ডপের ভিড়ে টাইগার সংঘের সুউচ্চ প্রতিমা আর তাহেরপুরের চকলেট প্রতিমাই এবার রাজশাহীর পূজার সবচেয়ে আলোচিত দুটি আকর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিও দেখে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসছেন প্রতিমা দুটি দেখতে, আর তাতেই জমে উঠেছে উৎসবের আমেজ।



