সচিবালয় যাচ্ছে শেরেবাংলা নগরে: মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন, ২০২৯ থেকে নতুন ঠিকানায় অফিসের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ সচিবালয় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট খবরে বলা হয়েছে, নতুন জায়গায় ২০২৯ সাল থেকে অফিস শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলে সিদ্ধান্তটি শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমানে সচিবালয় অবস্থিত আবদুল গনি রোডে। প্রেস ব্রিফিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অবস্থানে ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমিতে রয়েছে ১৩টি ভবন। এর মধ্যে আটটি ভবন নির্মিত হয়েছে স্বাধীনতার আগে। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন নির্মিত হয় ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে, আর ৫ নম্বর ভবন নির্মিত হয় ১৯৪৭ সালে।
এই পুরোনো ভবনগুলোই স্থানান্তরের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি। ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, এসব ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ভূমিকম্পপ্রবণ ঢাকা শহরে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় ঝুঁকি রয়ে গেছে — প্রতিদিন হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাপ্রার্থী এই ভবনগুলোতে যাতায়াত করেন।
ঝুঁকির পাশাপাশি রয়েছে জায়গার সংকট। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মপরিসর ও ওয়াশ-ব্লক না থাকায় স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে। বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং সচিবালয় চত্বরের বাইরে থাকা দপ্তরগুলোর স্থানসংকুলানের জন্য আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি জায়গা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতেই প্রস্তাব করা হয়েছে শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থাপনের। লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে স্থাপত্য অধিদপ্তর এ জন্য ধারণাগত নকশা তৈরি করেছে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার স্থাপত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে নকশার ধারণা থেকে বোঝা যায়।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নির্মাণ করা হবে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন। এতে মোট জায়গা থাকবে প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট — যা বর্তমান সচিবালয়ের অফিস স্পেসের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বাইরে ছড়িয়ে থাকা দপ্তরগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ির জন্য, যার মধ্যে ২০০টি থাকবে ভূ-উপরিস্থ পার্কিংয়ে। বর্তমান সচিবালয় এলাকায় যানজট ও পার্কিং সংকট নিত্যদিনের ভোগান্তি — নতুন কমপ্লেক্সে এই পরিকল্পনা সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নেওয়া বলে মনে করা যায়।
প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সে থাকবে মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি বহুমুখী হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি ডাকঘরসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কংক্রিটের ভিড়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়।
নীতিগত অনুমোদন মানেই কাজ শেষ নয় — এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ। এখন বিস্তারিত নকশা, ব্যয় নির্ধারণ ও প্রকল্প অনুমোদনের পালা। তবে ২০২৯ সাল থেকে নতুন সচিবালয়ে অফিস শুরুর যে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে আবদুল গনি রোডের প্রায় শতবর্ষ পুরোনো প্রশাসনিক কেন্দ্রের যুগ শেষ হয়ে শুরু হবে শেরেবাংলা নগরের নতুন অধ্যায়।
সচিবালয় স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি ভবন বদলের খবর নয়। ভূমিকম্প ঝুঁকি, কর্মপরিবেশ, জায়গার সংকট আর আধুনিক প্রশাসনের চাহিদা — সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে দেশের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায়। আগামী দিনগুলোতে প্রকল্পের বিস্তারিত, ব্যয় ও সময়সূচি প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে, পরিকল্পনাটি কত দ্রুত কাগজ থেকে মাঠে নামে।




