বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
সর্বশেষ হালনাগাদ:
প্রচ্ছদ › বিনোদন › খবর
বিজ্ঞাপন
এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিনবড়লেখা টুডে — বড়লেখা-সিলেট ও প্রবাসের নিয়মিত পাঠকের কাছে আপনার ব্যবসাকে পৌঁছে দিনবিজ্ঞাপনের তথ্য →
বিনোদন

সত্যজিৎ থেকে রাজ চক্রবর্তী: বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে দুর্গাপূজার শতরূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক • • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, আর বাঙালি যুগে যুগে মুগ্ধ হয়েছে শরতের রূপে। এই দুই টান একসঙ্গে মিশে যাওয়ায় সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে শরতের প্রকৃতি আর দুর্গাপূজা বারবার ফিরে এসেছে — কখনো গল্পের প্রাণ হয়ে, কখনো প্রতীক হয়ে, কখনো শুধু একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে এ সময়ের রাজ চক্রবর্তী পর্যন্ত বহু নির্মাতার ছবিতে পূজা এসেছে নানা ভঙ্গিতে, যদিও বাংলাদেশের সিনেমায় পূজার চিত্রায়ণ তুলনামূলকভাবে কমই হয়েছে।

বাংলাদেশের ছবির দিকে তাকালে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর কথা আসে সবার আগে। সেখানে সদ্য মাতৃহারা সন্তানের কাছে দেবী দুর্গা যেন মা হয়ে ধরা দেন। বাদল খন্দকারের ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, গাজী জাহাঙ্গীরের ‘জীবন সীমান্তে’, মহিউদ্দিন ফারুকের ‘বিরাজ বউ’ ও বাবুল চৌধুরীর ‘মা’ ছবিতে গল্পের প্রয়োজনে পূজা এসেছে।

গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তে পূজার আগমন আরও গভীর। ঝড়ের বিধ্বংসী রূপে জেলেপাড়ার বাড়িঘর ভেঙে পড়ার পর সেগুলো সম্মিলিত উদ্যোগে মেরামতে ব্যস্ত মানুষের জীবনে বিষাদের মাঝে উৎসবের উপলক্ষ হয়ে আসে দুর্গাপূজা। তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ ছবিতে পূজা এসেছে প্রতীকী দৃশ্যে — নদীতে ভেসে থাকা ধর্ষিতা বাসন্তী যেন অসুরশক্তির জয় আর সত্য-সুন্দরের পরাজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

কলকাতার বাংলা ছবিতে দুর্গাপূজার চিত্রায়ণ প্রথম করেন সত্যজিৎ রায়। ‘পথের পাঁচালী’-তে ঢাকের তালে অপু, দুর্গাসহ শিশুদের দল মন্দিরের দিকে এগিয়ে যায়, আর তা চেয়ে দেখেন মা সর্বজয়া — বাংলা সিনেমার ইতিহাসে চিরায়ত এক দৃশ্য। গল্পের প্রয়োজনে ‘দেবী’ ছবিতেও তিনি পূজা এনেছিলেন, আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’-এর শুরুর দৃশ্যায়নই দুর্গাপূজা নিয়ে; শিশু রুকু প্রতিমার কারিগরের কাছে শোনে অসুরবধের কাহিনি, যা সব শিশু-কিশোরের কাছেই রোমাঞ্চকর।

ঋতুপর্ণ ঘোষ একটি ক্ষয়িষ্ণু বনেদি পরিবারের পূজার উৎসবের মাঝখানে পারিবারিক গল্প বুনেছিলেন ‘উৎসব’ ছবিতে — পুরো সিনেমাজুড়েই ছিল পূজার আবহ। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এই ছবিতে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণা, মমতা শংকরসহ অনেকে। তাঁর প্রথম ছবি ‘হীরের আংটি’ ও ‘অন্দরমহল’-এও দুর্গাপূজা ছিল।

বিভূতিভূষণের গল্প অবলম্বনে তরুণ মজুমদারের জনপ্রিয় ছবি ‘আলো’-তে পূজা এসেছে অভাবতাড়িত গ্রামে আলোকবর্তিকা হয়ে। তাঁর ‘পলাতক’, ‘বালিকা বধূ’, ‘দাদার কীর্তি’ ও ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ ছবিতেও পূজা ফিরে এসেছে। রাজা সেনের ‘দেবীপক্ষ’-তে পূজা হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা, আর শিবু-নন্দিতার ‘বেলাশেষে’-তে পূজা এসেছে পারিবারিক সম্প্রীতির মেলবন্ধন হিসেবে।

বিজয়া দশমীর সিঁদুরখেলা বাঙালি নারীর চিরাচরিত ঐতিহ্য — সাদা থান, লাল পাড়ের শাড়ি। অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ ছবিতে রাখী গুলজারের দেবী দুর্গাকে সিঁদুর পরানোর দৃশ্য আইকনিক হয়ে আছে দর্শকের মনে। এই একটি দৃশ্যেই পূজা, নারীত্ব আর বিদায়ের বেদনা একসঙ্গে ধরা পড়েছে।

শরতের পূজা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হলেও শরৎ ছাড়া অন্য সময়েও পূজা এসেছে পর্দায়। সৃজিত মুখার্জির বিকল্পধারার ছবি ‘উমা’-তে বিদেশে থাকা অসুস্থ মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে কলকাতায় নকল দুর্গাপূজার আয়োজন করেন বাবা — ছবিটি বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিত হয়। ‘জাতিস্মর’-এ পূজা করেছিলেন কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গি, আর অরিন্দম শীলের ‘দুর্গাসহায়’ ছবিটিও এই ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গান ছাড়া আজকাল পূজা যেন জমেই না। ‘ঢাকের তালে কোমর দোলে, খুশিতে নাচে মন’ — রবি কিনাগী পরিচালিত, দেব অভিনীত ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে’ ছবির এই গান পূজা উপলক্ষে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সাড়া জাগানো ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’-এ এসেছে বনেদি বাড়ির পূজা আর গুপ্তধনের খোঁজ, আর কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিসর্জন’-এ পূজার গল্পের সঙ্গে বিসর্জনের আবহ — পদ্মা চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হন জয়া আহসান।

পর্দার বাইরে শাস্ত্রীয় ভিত্তিও গভীর। রামায়ণের অনেক আগে থেকেই মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবী পুরাণ, কালিকা পুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণসহ নানা গ্রন্থে দেবী দুর্গার উপাসনা-রীতি ও পূজা পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। জ্ঞানশক্তি, সম্পদশক্তি ও সংগ্রামকৌশলের শিক্ষায় আসুরিক শক্তির বিনাশে সিদ্ধিশক্তির সম্মিলনের প্রক্রিয়াও সেখানে বিধান আকারে লেখা আছে, আর সেই বিশ্বাস থেকেই ভক্তরা দুর্গাকে ভালোবাসা, ক্ষমা, সরলতা, পবিত্রতা ও ত্যাগের আদর্শ হিসেবে অর্চনা করেন।

সাহিত্যেও দুর্গা এসেছেন নানা রূপে — কখনো মাতৃরূপে, কখনো শক্তিরূপে, কখনো কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ দুর্গাকে ‘আনন্দময়ী’ বলে আরাধনা করেছেন মুক্তি ও ভক্তির সঙ্গে; তাঁর কাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক এমনকি চিঠিপত্রেও দুর্গোৎসবের অপরূপ বর্ণনা ফুটে উঠেছে। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে বিমলা, সন্দীপ ও নিখিলেশ চরিত্রগুলোকে তিনি দুর্গার সর্বজনীন সমন্বিত রূপবৈচিত্র্যে সাজিয়েছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম দুর্গাকে দেখেছেন ‘রক্তাম্বরধারিণী রূপে’। গান, কবিতা, উপন্যাস ও ছায়াবাণীর পাশাপাশি শাক্ত পদাবলি রচনা করে তিনি এই ধারায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ দুর্গাকে কল্পনা করেছেন ‘শশাঙ্কধারিণী রূপে’ এবং দেবী বিসর্জনের ট্র্যাজেডির অসাধারণ বর্ণনা দিয়ে কাব্য শেষ করেছেন — ‘বিসর্জি প্রতিমা যেন দশমী দিবসে, সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।’

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও জ্যোতির্ময়ী দুর্গার প্রভাববলয় থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারেননি; পার্বতী ও দুর্গা নামে কোমল, কঠিন ও মমতাময়ী চরিত্রায়ণে তিনি সাহিত্যসৃষ্টিকে আরাধনায় রূপান্তরিত করেছেন। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন দুর্গার মাতৃমুখী সংস্কৃতির লাবণ্য, আর বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গা, সতু, মালতী, হরিহর ও ইন্দির ঠাকরুনের জগতে শরতের শুভ্র, শীতল, কোমল ব্রহ্মশক্তির আরাধনা দারিদ্র্যমুক্তির অবলম্বন হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। পূজা তাই বাঙালির কাছে শুধু উৎসব নয় — তার গল্প বলার সবচেয়ে পুরোনো ও প্রাণবন্ত ভাষাগুলোর একটি।

বিজ্ঞাপন
এখানে আপনার বিজ্ঞাপন দিনবড়লেখা টুডে — বড়লেখা-সিলেট ও প্রবাসের নিয়মিত পাঠকের কাছে আপনার ব্যবসাকে পৌঁছে দিনবিজ্ঞাপনের তথ্য →

বিনোদন বিভাগের আরও খবর

বিনোদন • ১ মিনিটে পড়ুন

বক্স অফিসে রজনীকান্ত ঝড়, তিন বছর পর ‘জেলার টু’ নিয়ে ফিরলেন সুপারস্টার

বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে তামিল সুপারস্টার রজনীকান্তের নতুন সিনেমা ‘জেলার টু’। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি ঘিরে দর্শকদের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো।…

বিনোদন • ৫ মিনিটে পড়ুন

গান নয়, তবু মঞ্চ কাঁপান তারাই—আফ্রোবিটসের হাইপ শিল্পীদের উত্থান

তারা পুরোপুরি গানও করেন না, র‍্যাপও করেন না—তবু তাদের উপস্থিতিতেই জমে ওঠে পার্টি, বিয়ের আফটার-পার্টি আর করপোরেট অনুষ্ঠান। উচ্চশক্তির তাৎক্ষণিক কণ্ঠ, …

বিনোদন • ১ মিনিটে পড়ুন

২৫ হাজার কোটির সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী কাব্য মারানের বিয়ে

২৫ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী — তিনি কাব্য মারান। সান গ্রুপের চেয়ারম্যান কালানিধি মারানের মেয়ে কাব্য এবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে…