নিষেধাজ্ঞার ১১ দিনেও থামেনি মা ইলিশ শিকার, পদ্মাপাড়ে প্রকাশ্যে বসছে অবৈধ হাট
নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নদী ও সাগরে ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও থামেনি মা ইলিশ শিকার। মাদারীপুরের শিবচর ও রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীতে প্রতিদিন অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করে প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন একদল জেলে; একই দৃশ্য দেখা গেছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতেও।
মৎস্য অধিদপ্তর ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই সময়ে ইলিশ শিকার, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যাতে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে। রোববার নিষেধাজ্ঞার ১১তম দিন শেষ হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে জাল জব্দ, কারাদণ্ড ও জরিমানার পরও অসাধু জেলেদের দৌরাত্ম্য থামেনি। বরং নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ধরা মাছ নদীর পাড়েই প্রকাশ্যে বেচাকেনা হচ্ছে, আর পেটে ডিমভর্তি ইলিশ কিনতে ছুটে যাচ্ছেন শত শত ক্রেতা।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা এবং চরজানাজাত ইউনিয়নের হীরাখার বাজারসংলগ্ন পদ্মার পাড়ে প্রতিদিন দেদার বিক্রি হচ্ছে মা ইলিশ। এসব ইলিশ পদ্মা থেকে ধরে নৌকায় করে তীরে আনা হয়। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে পদ্মার চরাঞ্চলে ক্রেতাদের আনাগোনা লেগেই আছে।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরখোলা ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে পদ্মাপাড়ের কাজিরসূরা বাজারের পাশেই বসেছে ইলিশের অস্থায়ী হাট। নদীর পাড়ে একের পর এক ট্রলার এসে ভিড়ছে, আর ট্রলারে বসেই ইলিশ বিক্রি করছেন জেলেরা। অবৈধভাবে শিকার করা বলে এসব ইলিশ তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম দামে বিক্রি হয়, ফলে ক্রেতাদের ভিড়ও দেখা যায় সেখানে।
কাজিরসূরা এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘রাতে ধরা ইলিশ ভোর থেকে বিক্রি শুরু হয়। ফজরের আজানের পরপরই মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। সকাল আটটা-নয়টার মধ্যে সকালের হাট ভেঙে যায়। এরপর দিনে যে মাছ ধরা হয়, তা নিয়ে আসরের পর বেচাকেনা শুরু হয়, চলে রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত। এ ছাড়া পদ্মা নদীর বিভিন্ন চর এলাকায় রাতেও মাছ পাওয়া যায়।’
ইলিশ কিনতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আসা প্রবাসীর স্ত্রী সুলতানা বেগম বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এই সময় পদ্মার তাজা ইলিশ পাওয়া যায়। এগুলো বরফ দেওয়া থাকে না। এ জন্যই কিনতে আসি।’ ক্রেতাদের এই চাহিদাই অবৈধ শিকারকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন অনেকে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী একাধিক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই সময়ে নতুন জেলেদেরও আগমন ঘটে। পদ্মার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ ধরা হয়, বিশেষ করে মধ্যরাতে ফেলা জালে মাছ বেশি ধরা পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাবাজার-চরজানাজাত সীমান্ত এলাকা ও হীরাখার বাজারসংলগ্ন নদীর পাড়সহ পদ্মার চর এলাকার চার-পাঁচটি স্থানে ইলিশের অবৈধ হাট বসে।
শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, ‘জনবলসংকটের কারণে পুরো এলাকায় শতভাগ নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’ শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে। পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ অস্থায়ী হাটগুলো বন্ধ করতে শিগগির বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
একই চিত্র রাজবাড়ীতেও। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মায় অবাধে চলছে ইলিশ শিকার, দিনের আলোতেই নদীর পাড়ে বসছে বিক্রির হাট। রাজবাড়ী সদরের উড়াকান্দা, গোদারবাজার ও মেছোঘাটা এবং গোয়ালন্দ উপজেলার অন্তার মোড়, কুশাহাটা ও কলারবাগান এলাকায় ইলিশ ধরা ও বিক্রি দেখা যাচ্ছে।
সদর উপজেলার জেলে বাবু বলেন, ‘প্রকৃত জেলেরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকার করছেন না। তবে মৌসুমি জেলেরা এ সময় অবাধে মাছ শিকার করছেন। এতে প্রকৃত জেলেদের পাশাপাশি মা ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ রাজবাড়ী সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ার ইসলাম পাইলট বলেন, জনবলসংকট ও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অভিযানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে; গত বছর অভিযানে কোস্ট গার্ডের সহযোগিতা পাওয়া গেলেও এ বছর তা পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো নদীতে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি। এর মধ্যেও লোকচক্ষুর আড়ালে অসাধু মৌসুমি জেলেরা মাছ শিকার করছেন।’
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে মা ইলিশ শিকার চলছে। শুক্রবার সকাল আটটার দিকে চরব্যারেট এলাকায় বহু নৌকায় জেলেদের মাছ শিকার করতে দেখা যায়; সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত চলে জাল তোলা-ফেলা, পরে মাছ নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘাটে ফিরে যান জেলেরা। ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বগী-তুলাতলা এবং দক্ষিণ চরওয়াড়েল থেকে চর রায়সাহেব পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে নামছেন জেলেরা। সরেজমিনে দেখা যায়, চরব্যারেট এলাকায় স্থানীয় এক যুবদল নেতার ছত্রচ্ছায়ায় জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ শিকার করছেন; এ বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
বাউফলের ইউএনও সালেহ আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পূজার নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে অভিযান জোরদার করা হবে। বাউফল উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘আমরা নদীতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। তবে বিশাল নদীর সব এলাকায় সব সময় নজরদারি করা সম্ভব হয় না।’
তিন জেলার চিত্র একই বার্তা দিচ্ছে—কাগজে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাঠে নজরদারির ঘাটতিতে মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ হুমকির মুখে। নিষেধাজ্ঞার বাকি দিনগুলোতে প্রশাসনের প্রতিশ্রুত সমন্বিত অভিযান কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এ মৌসুমের প্রজনন সুরক্ষা আর আগামী দিনের ইলিশ উৎপাদন।


