আজ মহাঅষ্টমী: ঢাকেশ্বরীতে বিহিত পূজা, রামকৃষ্ণ মঠে কুমারী পূজা, সন্ধ্যায় সন্ধিপূজা
দেবী দুর্গার আগমনের পর মহাসপ্তমী শেষ হয়েছে। আজ মহাঅষ্টমী। সোমবার (১৮ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেবীর মহাষ্টমী কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা শুরু হবে। এরপর দুপুরে মহা প্রসাদ বিতরণ হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার এই দিনটি ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশের মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
অষ্টমীর দিনে সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠে অনুষ্ঠিত হবে কুমারী পূজা। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। অষ্টমীর দিন বিশেষ আকর্ষণ থাকে কুমারী পূজা এবং সন্ধিপূজায়। সন্ধিপূজা দুর্গাপূজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এটি অসুরকে বধ করার সন্ধিক্ষণ হিসেবে পালিত হয়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়। প্রতিটি বয়সের কুমারীরই আলাদা আলাদা নাম ও মাহাত্ম্য রয়েছে।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে (ষোলো উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি আর দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে। হাজারো ভক্ত এই দৃশ্য দেখতে মঠ প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।
কুমারী পূজার তাৎপর্য প্রসঙ্গে পুরোহিতরা বলেন, অনেক চিন্তাশীল মানুষ অনুভব করছেন, আধুনিক পৃথিবীতে সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট নিরসন করে অগ্রগামী হতে হলে মাতৃজাতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। জগতের অনেক স্থানে নারীকে সম্মান দেওয়া হয় পত্নীরূপে বা সহকারিণীরূপে। কিন্তু নারীর সবচেয়ে মহিমময় রূপ তার মাতৃরূপ। তাই এই মহাষ্টমী তিথিতে আমরা জগতের সব মাতৃজাতিকে উদ্দেশ্য করে কুমারী মাতাকে প্রণাম জানাই।
পুরোহিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমারী মাতার মাধ্যমে আদ্যাশক্তিকে প্রণাম নিবেদন করা হয়। কুমারী পূজা মূলত নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক। যুগ যুগ ধরে এই পূজা নারীর মর্যাদা ও মাতৃশক্তির জয়গান গেয়ে আসছে। আধুনিক সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য যখন আলোচনার বিষয়, তখন এই প্রাচীন আচার নতুন করে তাৎপর্য পায়।
অশুভ শক্তিকে শোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দুসম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। যদিও দেবী আসার ঘণ্টা বেজে যায় মহালয়ার দিন থেকেই। সনাতন ধর্ম মতে, যা কিছু দুঃখ-কষ্টের বিষয়, যেমন– বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। শাস্ত্রকাররা দুর্গা নামের অর্থ করেছেন— দুঃখের মাধ্যমে যাকে লাভ করা যায়, তিনিই দুর্গা।
দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন। এ বছর ভক্তদের কষ্ট দূর করতে দেবী দুর্গা এসেছেন ঘোড়ায় চড়ে আর আগামী বুধবার দশমীর দিন বিদায় নেবেন নৌকায়। দেবীর এই আগমন ও বিদায়ের বাহন নিয়ে প্রতি বছরই ভক্তদের মধ্যে আলোচনা থাকে।
মহালয়াতেই দেবী আগমনের ঘণ্টা বাজে আর বিজয়া দশমী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহা-আরতির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। আগামী মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর মাধ্যমে বিদায় নেবেন দুর্গা দেবী।
বিজয়া দশমীর দিন মঙ্গলবার বিকাল ৩টার পর থেকে প্রতিমা বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন হবে। প্রতি বছরের মতো এবারও এই শোভাযাত্রায় হাজারো ভক্ত অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পূজা ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাহারা বসানো হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের প্রত্যাশা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মহাঅষ্টমীর এই পুণ্য তিথিতে ভক্তদের প্রার্থনা—অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক দেশ।





