দুই বছরের প্রকল্প নয় বছরে: সোমবার ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী, খুলছে জনসাধারণের জন্য
প্রায় নয় বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে রাজধানীর ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে আধুনিকায়িত এই উদ্যান এবং সেখানে নবনির্মিত 'জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ' সোমবার (১৯ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পর উদ্যানটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। দীর্ঘ এক দশক পর এই খবরে উচ্ছ্বসিত রাজধানীবাসী।
প্রায় ২৪ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যান একসময় পুরান ঢাকা তথা রাজধানীর সাধারণ মানুষের হাঁটা, বিশ্রাম ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। কিন্তু উন্নয়নকাজের দীর্ঘসূত্রতায় প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নগরবাসী। সচিবালয়সংলগ্ন এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি বছরের পর বছর কনস্ট্রাকশন সাইটে পরিণত হয়েছিল, আর নগরবাসী তাকিয়ে ছিলেন কবে খুলবে এর দুয়ার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন 'গোস্বা নিবারণী পার্ক' নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যানটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আধুনিকায়নের কাজ শেষ করে উদ্যানটি নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় নয় বছরেও তা সম্ভব হয়নি।
দুই বছরের প্রকল্প কেন নয় বছরে গড়াল, তার পেছনে রয়েছে ঠিকাদারি জটিলতা ও অনিয়মের অভিযোগ। শুরুতে ২০১৭ সালে উদ্যানের উন্নয়নকাজের দায়িত্ব পায় দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নানা অনিয়ম ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পরে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিই শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করেছে।
সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রথমে এ কাজের জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও পরে নকশায় পরিবর্তন আনার ফলে নির্মাণ ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৩৮ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে গত নয় বছরে উদ্যানটিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেশিয়াম, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, লেকের পাড় উন্নয়ন, ঘাট, হাঁটার পথ ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের 'জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ'। এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে।
স্তম্ভটির সঙ্গে থাকা অর্ধগোলাকার অংশে ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। উদ্যানের দুই পাশের প্রবেশপথে ইংরেজি '২৪' সংখ্যার আদলে দুটি ফটকও তৈরি করা হয়েছে—যা জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ধারণ করে।
আধুনিকায়িত উদ্যানে পাঠাগার, খাবারের দোকান, গাড়ি রাখার স্থান, ব্যায়ামাগার, টেবিল টেনিস ও বিলিয়ার্ড খেলার ব্যবস্থা, এটিএম বুথ, ওষুধের দোকান, নগর জাদুঘর, শিশুদের খেলার জায়গা, লেকের পাড় ও ঘাট, মাঠ এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুনভাবে সাজানো উদ্যানে হাঁটার পথ, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর সুবিধা, রেস্তোরাঁ, আধুনিক গ্রন্থাগার, শিশুদের খেলার নির্দিষ্ট স্থান, কৃত্রিম পানির ফোয়ারা ও মনোরম জলধারা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, প্রায় ১০ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে নগরবাসী এ দৃষ্টিনন্দন উদ্যানটি ব্যবহার করতে পারবেন। জুলাই শহীদ ও জুলাই বীর যোদ্ধাদের স্মরণে এখানে বিশেষ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি দর্শনার্থীদের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি স্মরণ করার সুযোগ করে দেবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সচিবালয়সংলগ্ন এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পরিবেশ মনোরম রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। উদ্যানটি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণের একটি স্মারক হিসেবেও কাজ করবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে উদ্যানটির আধুনিকায়নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় হাজারো গাছ কেটে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওসমানী উদ্যানে অবকাঠামোগত কাজ বেশি করতে গিয়ে পার্কটির নিজস্ব চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃতিবান্ধব নকশায় উন্নয়নকাজ করা হলে এত বেশি সময় লাগত না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। আসলে একটি চক্র আছে, যারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারণ, এসব কাজে বাজেট বেশি থাকে, দুর্নীতির সুযোগও বেশি—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
সমালোচনা থাকলেও প্রায় এক দশক পর ওসমানী উদ্যান উন্মুক্ত হওয়ার খবরে উচ্ছ্বসিত নগরবাসী। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে এটি ছিল প্রাণের জায়গা—সকালের হাঁটা, বিকেলের আড্ডা, শিশুদের খেলা। দীর্ঘ বন্ধের পর সেই প্রাণ ফিরে আসবে বলে আশা করছেন সবাই। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে উদ্যানটির নতুন যাত্রা শুরু হলে তা হবে রাজধানীবাসীর জন্য বহুল প্রতীক্ষিত একটি দিন।





