ক্যানসার চিকিৎসায় যাবে স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ, যন্ত্রপাতিতে শুল্কমুক্তির ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের একটি বিরাট অংশ ক্যানসারের চিকিৎসাসেবা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সোমবার সকালে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ক্যানসার কংগ্রেস ২০২৬’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের মোট বাজেটের সিংহভাগ অর্থই ক্যানসার চিকিৎসায় বরাদ্দ দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্যানসারের বিস্তার রোধ ও এর প্রতিরোধে যা যা করণীয়, তার সবই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্পন্ন করবে সরকার। ফলে অর্থের অভাবে যাতে কোনো রোগীর চিকিৎসা আটকে না থাকে, সেই দিকটিকেই এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসার জন্য অত্যাধুনিক মেশিনপত্র স্থাপন কিংবা তা অপসারণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা বা প্রশাসনিক জটিলতা বরদাশত করা হবে না। এই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামাদি আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
শুল্কমুক্তির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালগুলোতে আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আনা সহজ হবে বলে অনুষ্ঠানে আশা প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনে দেরি হয়, আর সেই দেরির মাশুল দিতে হয় রোগীদেরই। মন্ত্রীর বক্তব্যে সেই জট খোলার স্পষ্ট বার্তা এসেছে।
ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা সহজ ও সহজলভ্য করতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে বলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর আগে জানিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে ছয়টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ১১টি মেশিন স্থাপন করা হবে।
রেডিওথেরাপি মেশিনগুলো স্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবলের প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। যন্ত্র থাকলেও তা চালানোর দক্ষ জনবল না থাকলে রোগীরা সুফল পান না — সেই ঘাটতি পূরণেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সুদীর্ঘ সতেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা দেশের গোটা স্বাস্থ্য খাতকে মারাত্মকভাবে পঙ্গু ও পিছিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। সেই প্রেক্ষাপটে ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল ও জটিল রোগের চিকিৎসায় বড় বরাদ্দের ঘোষণাকে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য খাতকে আবার দাঁড় করানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে মন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি সহ্য করা হবে না। দায়িত্ব পালনে কেউ ন্যূনতম অবহেলা করলে তার চাকরি রক্ষা হবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
‘ন্যাশনাল ক্যানসার কংগ্রেস ২০২৬’-এ দেওয়া এই ঘোষণাগুলো ক্যানসার রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দেশে ক্যানসার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হয় — সরকারি হাসপাতালে সেবা বাড়লে সেই চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্ত্রী বলেন, ক্যানসারের বিস্তার রোধ ও প্রতিরোধে যা যা করণীয়, তার সবই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে করা হবে। অর্থাৎ শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধের দিকটিকেও সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
ঘোষণা অনুযায়ী বাজেটের বড় অংশ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয়, যন্ত্রপাতিতে শুল্কমুক্তি এবং ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন — এই তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এখন সবার দৃষ্টি বাস্তবায়নের দিকে। বরাদ্দের অর্থ কীভাবে, কোন কোন হাসপাতালে এবং কত দ্রুত পৌঁছাবে, শুল্কমুক্তির ব্যবস্থা কবে কার্যকর হবে এবং রেডিওথেরাপি মেশিনগুলো কবে রোগীদের সেবা দিতে শুরু করবে — এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই ঘোষণার প্রকৃত সুফল বোঝা যাবে।



