জন্ম চট্টগ্রামে, ঘর ঢাকায়—ঠাকুরগাঁওয়ে আগে কখনো না এসেও এমপি প্রার্থী আলীম নিজামী
জন্ম চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে, সংসার ঢাকার আশুলিয়ায়। ঠাকুরগাঁওয়ে নেই কোনো পারিবারিক শিকড়, নেই আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনের বলয়। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে কখনো এই জেলায় আসাও হয়নি তাঁর। সেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে এবার সংসদ সদস্য পদে লড়ছেন আব্দুল আলীম নিজামী।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য নিজামী ‘বটগাছ’ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন। স্থানীয় ভোটারদের কাছে তিনি একেবারেই নতুন মুখ, আর সেই নতুনত্বই তাঁর প্রচারের সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে।
প্রচারের বহর তাঁর খুবই সীমিত। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মীও তেমন নেই। ভোটের মাঠে তাঁর প্রচারের বড় ভরসা মাত্র চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশা, মাইক আর লিফলেট—এই সামান্য সম্বল নিয়েই আসনের ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
তবে সীমিত প্রচার সত্ত্বেও আট দফা কর্মসূচি নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে যাওয়ার চেষ্টা করছেন নিজামী। তাঁর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পেছনে স্থানীয় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির চেয়ে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়নের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অবমাননা ও কটূক্তি বন্ধে কার্যকর আইন প্রণয়নের লক্ষ্য সামনে রেখেই সংসদে যেতে চান তিনি।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও শহরের আর্ট গ্যালারি মোড়ে সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের নির্বাচনী পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেন আব্দুল আলীম নিজামী। তিনি জানান, দেশের যেখানেই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেখানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত তিনি আগেই নিয়েছিলেন। ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হওয়ার পর সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই এখানে প্রার্থী হয়েছেন তিনি।
নিজামীর মতে, সংসদের বাইরে থেকে ধর্মীয় অবমাননা ও কটূক্তি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ সীমিত। এ কারণে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে সংসদ সদস্য হতে চান তিনি। তাঁর আট দফা কর্মসূচির অন্যতম বিষয়ও এটি। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর প্রচারে।
আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারছেন না বলে জানান নিজামী। চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় মাইক লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন, ভোটারদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন লিফলেট। তবে রিকশায় ঘুরে আসনের সব ভোটারের কাছে পৌঁছানো যে কঠিন, সেটিও তিনি খোলামেলাই স্বীকার করেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী নয় বলেও জানান এই প্রার্থী। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় পর্যায়ে দলের সক্রিয় নেতাকর্মী প্রায় নেই বললেই চলে। তবে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ্জী হুজুরের এক প্রবীণ অনুসারী তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। প্রচারের সুবাদে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন এবং তাদের কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে তাঁর পক্ষে কাজ করছেন বলে দাবি করেন নিজামী।
নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য বেশ আলাদা। তাঁর মতে, সংসদ সদস্যের মূল কাজ জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা রাখা। উন্নয়ন বরাদ্দের জন্য সংসদ সদস্য হওয়ার পক্ষে নন তিনি; তাঁর মতে, স্থানীয় উন্নয়ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। অবশ্য নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ি তৈরি করে নিয়মিত থাকার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে নিজামী ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাধনপুরে হিন্দু শীল পরিবারের ১১ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই অনেক আসামির মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা দায়ের, তদন্ত, বিচার, আপিল ও রায় কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা করতে চান তিনি। তাঁর মতে, দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব।
নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটারদের কাছে সমর্থন চেয়েছেন নিজামী। মুসলিম ভোটারদের ধর্মীয় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছেও বটগাছ প্রতীকে ভোট চেয়েছেন এই প্রার্থী। অচেনা আসনে, অচেনা ভোটারদের মাঝে তাঁর এই ব্যতিক্রমী প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কতটা সাড়া ফেলে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।




