কিয়েভে রুশ হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র, অভিযোগ জেলেনস্কির
রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রোববার সন্ধ্যায় কিয়েভের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে চালানো হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা মেলেনি বলে সোমবার সকালে জানান তিনি। এই অভিযোগের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের চলমান টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্যে এসেছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত সোমবার সকালে টেলিভিশনে বলেন, রাত প্রায় ১১টার দিকে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানার আগে ইউক্রেন কোনো সতর্কবার্তা পায়নি। এর আগে ইউক্রেন সরকারের এক কর্মকর্তাও একই কথা জানিয়েছিলেন। তবে রাত ৩টায় চালানো পরবর্তী হামলার আগে সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল বলে ইহনাত যোগ করেন।
সোমবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে জেলেনস্কি লিখেছেন, রাশিয়া সারা রাত ধরে একাধিক ঢেউয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং আবারও অংশীদারদের কাছ থেকে কোনো সতর্কবার্তা আসেনি। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ আটকে থাকা আর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড় বা বিলম্ব — এগুলো অংশীদারদের পক্ষ থেকে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্ত। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর আরোপিত একটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ স্থগিত করেন। প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে পরিচিত এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষেই পাস হওয়া সেই আইনটি স্থগিত করা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন বলে তিনি কংগ্রেসকে জানান। ইউক্রেন পিএসি-৩ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ধীর হয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছে।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, রাশিয়া নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত খুবই সহজ — তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এমন কিছু করতে চান না, যা বোকার মতো রাশিয়াকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে ঠেলে দেবে। জেলেনস্কি পরোয়া করেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি এবং ইউরোপের দেওয়া অর্থের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জেলেনস্কি এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না, সম্ভবত কখনো চানওনি।
বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সতর্ক করে এসেছে, যাতে কর্তৃপক্ষ কয়েক মিনিটের মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে বেসামরিক মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু ইউক্রেন বলছে, জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধের মধ্যে গত এক সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার ভোরে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফরের সময় এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, গত রাতে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তা তিনি ঠিক জানেন না। তবে কয়েক রাত আগে ইউক্রেনের আগাম সতর্কব্যবস্থায় একটি সফটওয়্যার সমস্যা ছিল বলে তিনি জানেন। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে সেই সফটওয়্যার ত্রুটির কথা উল্লেখ করেননি। অন্তত একটি ক্ষেত্রে ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল, দক্ষিণ রাশিয়ার ওপর খারাপ আবহাওয়ার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি দেখা যায়নি। রুবিও জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউরোপীয় কমান্ড হামলাগুলোর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য দেওয়া সেবা ও কর্মসূচিগুলো হঠাৎ ব্যর্থ হতে শুরু করলেও যুক্তরাষ্ট্র তার যুক্তিসংগত অস্বীকৃতির অবস্থান ধরে রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসন অস্বীকার করেছে যে তারা ইউক্রেনে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের সেবা কমিয়ে দিয়েছে — যে সেবা ইউক্রেন আক্রমণাত্মক ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র দুটোতেই ব্যবহার করে।
ইউক্রেন আরও বলেছে, পিইউআরএল কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র — যেখানে ইউরোপ মার্কিন অস্ত্র কিনে ইউক্রেনে পৌঁছে দেয় — সেগুলোর সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন কিয়েভকে হুমকি দিয়েছিল বলেও খবরে বলা হয়েছে — রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ ধীর করে দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ার অভিযোগ এখন শুধু একটি রাতের হামলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ, নিষেধাজ্ঞা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা — সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, জেলেনস্কির সর্বশেষ মন্তব্য তাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আগামী দিনে সতর্কব্যবস্থা নিয়ে মার্কিন তদন্তের ফল এবং দুই পক্ষের বক্তব্যই বলে দেবে, এই টানাপোড়েন কোন দিকে যায়।





