ফ্রান্সে দাঙ্গার আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতা, মন্ত্রীদের পদত্যাগের প্রস্তাব নাকচ করলেন মাখোঁ
ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মাত্রা আগে থেকে আন্দাজ করতে না পারায় বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে উঠেছে যে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন মন্ত্রী পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন, আর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে শনিবার সারা দেশে ১১০টি মিছিলে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। অথচ গোয়েন্দাদের আগাম ধারণা ছিল বিক্ষোভকারীর সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি থাকবে। আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখের মতো।
বিক্ষোভ চলাকালে গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, দেড় হাজারের বেশি দোকান লুট বা ধ্বংস করা হয় এবং বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবনে হামলা চালানো হয়। লিমোজে দাঙ্গাকারীরা ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি সিটি হলে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়; দুটি বিশ্বযুদ্ধেও টিকে থাকা ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে।
সোমবারও অচলাবস্থা কাটেনি। শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীরা লুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ আটকে রাখায় জাদুঘরটি বন্ধ ছিল, ফলে অস্থিরতা নতুন সপ্তাহেও গড়িয়েছে।
মাঠে মোতায়েন ছিলেন প্রায় ৬০ হাজার পুলিশ, জেন্ডার্ম ও নিরাপত্তা কর্মী। তবু ভিড়ের চাপে অনেক জায়গায় তাঁরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রায় এক হাজার আইনশৃঙ্খলা কর্মী ও অগ্নিনির্বাপণ কর্মী আহত হয়েছেন, অন্তত দুই হাজার চারশ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের হিসাবে প্রায় তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনিয়েজ স্বীকার করেন, শনিবার কয়েকটি বড় শহরে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আগাম প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল; বিক্ষোভকারীর সংখ্যা যেমন কম ধরা হয়েছিল, সহিংস গোষ্ঠীগুলো যে অস্থিরতাকে কাজে লাগাবে, সেটাও ঠিকমতো আন্দাজ করা যায়নি।
নুনিয়েজ প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি; বদলে তিনি পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা তথ্যের ব্যর্থতা কোথায় ঘটল, তার হিসাব চেয়ে একটি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারমন্ত্রী জেরাল দারমানাঁ আরও সরাসরি বলেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বিশেষ করে গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং চরম বামপন্থীদের গতিবিধি অনুসরণে ফ্রান্সের অসুবিধার কথা উল্লেখ করেন।
এই ব্যর্থতা বিস্ময়কর, কারণ অস্থিরতার লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ ধরেই স্পষ্ট হচ্ছিল। সেপ্টেম্বরে প্যারিসের আশপাশে শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও শ্রেণিকক্ষের নানা সমস্যা নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ আরও নানা গোষ্ঠীকে টেনে আনে।
১ অক্টোবর সরকারের সংকটকালীন বৈঠকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই বলেছিলেন, আন্দোলন স্কুল অবরোধ থেকে শহুরে সহিংসতার দিকে মোড় নেওয়ার একটি সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। তাঁরা এর পেছনে কট্টর বাম দল ফ্রান্স আনবাওড ও তার মিত্রদের ভূমিকা থাকার কথাও বলেছিলেন। তার পরও দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর কর্তৃপক্ষ শনিবারের বিশাল ঢলের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
শনিবারের সমাবেশে শিক্ষার্থী, ট্রেড ইউনিয়নকর্মী, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পুরোনো কর্মীসহ নানা গোষ্ঠী এক মঞ্চে এসেছিল। বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও মুখোশধারী ছোট ছোট দল আলাদা হয়ে দোকান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।
সহিংসতাকে ঘিরে অভিবাসন নিয়েও আলাদা রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ধ্বংসের জন্য ফ্রান্সের অভিবাসন নীতিকে দায়ী করেন। তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের দায়ী করেনি; তারা বলছে, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা নিয়ে গড়ে ওঠা বিক্ষোভকে চরম বাম জঙ্গি ও অপরাধীরা কাজে লাগিয়েছে।
মারিন ল্য পেনের ন্যাশনাল র্যালি এই সহিংসতাকে সরকার দেশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে প্রচার করছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাখোঁ তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না—এমন খোলা প্রতিযোগিতার আগে অভিবাসন, নিরাপত্তা ও ক্রয়ক্ষমতা ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠছে। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে আন্দোলনকে গোয়েন্দারা আগে থেকেই নজরে রেখেছিল, তার ভয়াবহতা তারা শেষ পর্যন্ত আন্দাজ করতে পারল না কেন।





