দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ঘিরে নৌবাহিনী নামাল বেইজিং, প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছেও তাইওয়ানের সঙ্গে উত্তেজনা
দক্ষিণ চীন সাগরের একটি বিতর্কিত প্রবালদ্বীপের আশপাশের জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। চীনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ‘অবৈধভাবে’ প্রবেশকারী জাহাজটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য তারা নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে জলপথটির উত্তরপ্রান্তে তাইওয়ান নিয়ন্ত্রিত দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছে তাইওয়ান।
চীনের সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন থিয়েটার কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস চার্লসটন’ চীন সরকারের কোনো অনুমোদন ছাড়াই স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের সাবিনা প্রবালদ্বীপসংলগ্ন জলসীমায় ‘অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ’ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ চীনের সার্বভৌম অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।” সেই সঙ্গে মার্কিন পক্ষকে অবিলম্বে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। জাহাজটিকে অনুসরণ ও পর্যবেক্ষণ করতে সঙ্গে সঙ্গেই নৌবাহিনী মোতায়েন করা হয় বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।
তবে এ বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটন সাধারণত এ ধরনের মিশনকে ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতার অভিযান’ বলে অভিহিত করে থাকে। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের শেষ এমন মিশন পরিচালিত হয়েছিল এক বছরেরও বেশি সময় আগে।
এদিকে ফিলিপাইনের এক সামরিক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, মার্কিন জাহাজটি ‘কোনো চীনা ভূখণ্ডে অনধিকার প্রবেশ করেনি’। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘আইনসম্মত চলাচলের’ জন্য কোনো দেশেরই পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই।
ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ দাবি সত্ত্বেও চীন দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং ও ম্যানিলার মধ্যে এই উত্তেজনা সবচেয়ে তীব্র রূপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত মাসে একই এলাকার কাছে একটি জ্বালানি সরবরাহ মিশনে যাওয়ার সময় ফিলিপাইনের একটি বোটে চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজ ধাক্কা দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। চীন ও ফিলিপাইন উভয়েই সাবিনা চর এবং পুরো স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে। ফিলিপাইনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও রয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তরপ্রান্তে ঘটা অন্য একটি ঘটনায় তাইওয়ান কোস্ট গার্ড জানায়, তাইওয়ান নিয়ন্ত্রিত প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী নিষিদ্ধ জলসীমায় চীনের একটি কোস্ট গার্ড জাহাজ প্রবেশ করেছে।
চীনা নৌযানটিকে ধাওয়া ও সতর্ক করতে তাইওয়ান তাদের ‘তাইচুং’ নামের জাহাজটি পাঠায়। এ সময় উভয় পক্ষ একে অপরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি বার্তা পাঠায়। তাইওয়ান কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চীনা জাহাজটি বার্তা পাঠায় — ‘তথাকথিত রিপাবলিক অব চায়না বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই’, যা তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক নাম। এর জবাবে তাইওয়ানের জাহাজটি বার্তা দেয় — ‘রিপাবলিক অব চায়না, অর্থাৎ তাইওয়ান একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ।’ এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বেশ কিছুক্ষণ ধরে অব্যাহত ছিল।
এ বিষয়ে চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স অফিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে গত সপ্তাহে তারা সতর্ক করে জানিয়েছিল, প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জের কাছে একটি চীনা মাছ ধরার নৌকার বিরুদ্ধে তাইওয়ান কোস্ট গার্ড জলকামান ব্যবহার করায় তাইওয়ানকে এর ‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’।
দক্ষিণ তাইওয়ান ও হংকংয়ের মাঝামাঝি অবস্থিত প্রাতাস দ্বীপপুঞ্জটি হালকাভাবে সুরক্ষিত এবং এর নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব তাইওয়ান কোস্ট গার্ডের হাতে। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলসহ দ্বীপটির আশপাশে চীনের কোস্ট গার্ডের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত এক ফোরামে মার্কিন কংগ্রেসের একটি রিভিউ কমিশনের চেয়ারপারসন মন্তব্য করেন, তাইওয়ানের পূর্বে চীনের কোস্ট গার্ডের এই টহল ‘খুব অস্থিতিশীল পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করছে।
একই দিনে সাগরের দুই প্রান্তে ঘটা এই দুই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের টানাপোড়েন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।






