হুতি হামলায় স্থগিত সৌদির মেগা বিনিয়োগ সম্মেলন, চাপে যুবরাজ সালমানের বড় পরিকল্পনা
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য চলতি বছর ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অভিঘাত, অর্থনৈতিক চাপ আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে একসঙ্গে একাধিক সংকটের মুখে পড়েছে তার বড় বড় পরিকল্পনা।
সংকটের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে দেশটির বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন 'ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ' (এফআইআই) স্থগিত হয়ে যাওয়া। আগামী ২৬ অক্টোবর রাজধানী রিয়াদে এই সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা ছিল। 'মরুভূমির দাভোস' নামে পরিচিত এই আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থনীতিবিদ ও বড় বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন, আর যুবরাজ সাধারণত এটিকে সৌদি আরবে বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রাণঘাতী হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেক পশ্চিমা সরকার তাদের নাগরিকদের সৌদি আরব সফর না করার পরামর্শ দিয়েছে, আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও হোটেল ও সম্মেলনস্থল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত গত সোমবার আয়োজকরা সম্মেলনটি আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন।
যুবরাজ হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসার পর গত এক দশকে মোহাম্মদ বিন সালমান কয়েকটি বড় বাজি ধরেছিলেন—হুতিদের পরাজিত করা যাবে, সৌদি অর্থনীতির আমূল রূপান্তর ঘটানো যাবে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে থাকবেন। কিন্তু এখন এই তিনটি ধারণাই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, আর বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিতের ঘটনাটি তার জন্য কঠিন এক বছরের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
হুতিদের প্রশ্নে সৌদি আরব দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তাদের পরাজিত করতে পারেনি। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে রিয়াদ আশা করেছিল, হুতি হুমকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাবে চলতি গ্রীষ্মে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু করে। এর মধ্যে হুতিরা ইয়েমেনে আরও ভূখণ্ড দখল করেছে এবং সৌদি আরবের ওপর হামলাও জোরদার করেছে।
যুবরাজের ঘনিষ্ঠদের মতে, এখন সৌদি আরবের সামনে কোনো সহজ পথ নেই। দেশটি চাইলে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়াতে পারে; অথবা এমন বিমান হামলা চালিয়ে যেতে পারে, যার সফলতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আরেকটি পথ হুতিদের সঙ্গে সমঝোতা—কিন্তু তা ইয়েমেনে তাদের শাসন আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুবরাজের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তবে এই চাপ নতুন নয়—২০২৬ সালের আগেই তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ায় বড় কয়েকটি প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে, আর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের বেতনও বাড়েনি।
বিনিয়োগের চিত্রও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পেছনে। যুবরাজের বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যের বিপরীতে প্রকৃত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক বছর আগে ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতিতে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল; এখন সংস্থাটি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা করছে।
২০২৭ সালে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসার ওপর। আর সেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখতে পারেন ট্রাম্প—যার ওপর নির্ভরতাই এখন রিয়াদের জন্য আরেকটি ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরব ভেবেছিল, ট্রাম্পের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে কাছে টানার চেষ্টা করেছে রিয়াদ। ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও গড়ে উঠেছে—সৌদি অর্থায়নে আয়োজিত গলফ প্রতিযোগিতায় ট্রাম্পের মালিকানাধীন গলফ কোর্স ব্যবহার করা হয়েছে, আর ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠানে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে সৌদি-সংশ্লিষ্ট একটি তহবিল।
তবু এই সম্পর্ক ও বিনিয়োগ ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি, যেটিকে এই বিশ্লেষণে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এমন একজনের ভাষায়, ট্রাম্প দীর্ঘ সময় কারও প্রতি অনুগত থাকেন না।
সব মিলিয়ে, রিয়াদের সামনে এখন এক কঠিন সমীকরণ: একদিকে হুতিদের সামরিক হুমকি, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ধাক্কা, আর তৃতীয় দিকে অনিশ্চিত মার্কিন মিত্রের আচরণ। বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা সেই চাপেরই সবচেয়ে প্রকাশ্য ইঙ্গিত—এবং সামনের দিনগুলোতে যুবরাজের পরিকল্পনার গতি নির্ধারিত হবে এই সংকটগুলো তিনি কতটা সামাল দিতে পারেন, তার ওপর।



