দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: যাত্রীবাহী সেবার জন্য অনুমোদন পেল বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স ১০
প্রায় এক দশকের অপেক্ষার পর বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় ৭৩৭ ম্যাক্স জেটটি অবশেষে বড় বাধা পেরোল। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর, ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) ৭৩৭ ম্যাক্স ১০-কে যাত্রীবাহী সেবার জন্য অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বছরের পর বছরের বিলম্বের অবসান ঘটল।
ওয়াশিংটনের এভারেটে বোয়িংয়ের কারখানায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি এই সার্টিফিকেশন সনদটি তুলে দেন বোয়িংয়ের ৭৩৭ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী জিম উইলিয়ামস এবং বোয়িং কমার্শিয়াল এয়ারপ্লেনসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ৭৩৭ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ক্রিস পেইনের হাতে।
এই অনুমোদন বোয়িংয়ের সুনাম ও আর্থিক ভিত্তি পুনরুদ্ধারের চলমান প্রচেষ্টায় আরেকটি মাইলফলক। বছরের পর বছর ধরে নিরাপত্তা, মান ও উৎপাদন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল মার্কিন এই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
পরিবহনমন্ত্রী ডাফি বলেন, হাজার হাজার ঘণ্টার টেস্ট ফ্লাইটসহ 'ব্যাপক নিরাপত্তা পর্যালোচনার' পর এই সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়েছে। তিনি একে মার্কিন উৎপাদন খাতের জন্য বড় বিজয় বলে আখ্যা দেন।
'ভেবে দেখুন, এখানে পৌঁছাতে প্রায় ১০ বছর লেগে গেল। ১০ বছর আগে আমাদের সবার চুলে সম্ভবত কিছুটা কম ধূসর রঙ ছিল,' এভারেটের কারখানা পরিদর্শনের সময় বলেন ডাফি।
ম্যাক্স ১০ বোয়িংয়ের সংকীর্ণ-ফিউজেলেজ (ন্যারো-বডি) বাজারে ফিরে আসার প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এয়ারলাইনগুলোর জন্য বড় এই উড়োজাহাজ একটি ফ্লাইটে আরও বেশি যাত্রী বহনের সুযোগ দেবে, ফলে প্রতি আসনে খরচ কমতে পারে।
যাত্রীদের জন্য এর অর্থ হতে পারে জনপ্রিয় রুটগুলোতে আরও বেশি আসনের সুযোগ। তবে ভাড়ায় এর প্রভাব নির্ভর করবে এয়ারলাইনগুলো উড়োজাহাজগুলো কীভাবে মোতায়েন করে এবং তাদের মধ্যে কতটা প্রতিযোগিতা থাকে তার ওপর।
বোয়িং কমার্শিয়াল এয়ারপ্লেনসের প্রেসিডেন্ট ও সিইও স্টেফানি পোপ ডাফির সফরকালে বলেন, এই সার্টিফিকেশন 'এমন একটি উড়োজাহাজ সরবরাহের পথ পরিষ্কার করে দিল যা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।'
বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাক্স ১০-এ সাধারণত ১৮৫ থেকে ২১০ জন যাত্রী বসতে পারবেন, যেখানে ম্যাক্স ৯-এ ১৭৫ থেকে ১৯৫ এবং ম্যাক্স ৮-এ ১৬০ থেকে ১৮০ জন যাত্রীর ধারণক্ষমতা। 'আজ সত্যিই খুব, খুব বিশেষ একটি দিন। এটি অনেকের বছরের পর বছরের কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফসল,' বলেন পোপ। 'এটি আমাদের পুনরুদ্ধারের আরেকটি বড় মাইলফলক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি উন্মুক্ত করল।'
সংস্থাটি ২০২৭ সাল থেকে উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ শুরু করবে বলে আশা করছে। প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য ২০১৭ সালে প্যারিস এয়ার শোতে এই একক-অইল জেটটি উন্মোচন করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক বাধা বারবার সার্টিফিকেশন বিলম্বিত করে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ছোট ম্যাক্স ৮-এর দুটি মারাত্মক দুর্ঘটনায় ইন্দোনেশিয়া উপকূলে ও ইথিওপিয়ায় ৩৪৬ জনের মৃত্যুর পর বোয়িংয়ের সংকট তীব্র হয়। ২০২৪ সালে আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি ম্যাক্স ৯-এর প্যানেল আকাশপথে খুলে গেলে বোয়িংয়ের উৎপাদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আবারও তীব্র তদন্ত শুরু হয়।
এই বিলম্ব বোয়িংয়ের ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আটকে রেখেছে। বিশ্বের ৩০-এর বেশি গ্রাহক এখনো পর্যন্ত ১,৫৫৫টি ম্যাক্স ১০ অর্ডার করেছে যা এখনো সরবরাহ হয়নি—এটি কোম্পানির মোট ৭৩৭ ম্যাক্স ব্যাকলগের ৩০ শতাংশেরও বেশি। বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, ডেল্টা এয়ার লাইনস, আমেরিকান এয়ারলাইনস ও রায়ানএয়ার। জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইনসও এই তালিকায় যোগ দেয়, ১০৫টি ম্যাক্স ১০ অর্ডার করে, সঙ্গে আরও ৩৫টির অপশন রাখে।
ম্যাক্স ১০ এয়ারবাসের এ৩২১নিও মডেল পরিবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি, যা ২০১৭ সাল থেকে সেবায় রয়েছে। সবচেয়ে বড় এ৩২১নিও ম্যাক্স ১০-এর চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করতে পারে এবং জ্বালানি ছাড়া আরও দূরে উড়তে পারে।
তবু বোয়িং ম্যাক্স ১০-কে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যাতে এটি পুরনো উড়োজাহাজের চেয়ে কম জ্বালানি পুড়িয়ে বেশি যাত্রী বহন করতে পারে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে জেট জ্বালানির মূল্য আকাশছোঁয়া হওয়ায় এটি এয়ারলাইনগুলোর জন্য আকর্ষণীয় সমন্বয় হতে পারে। ক্রমবর্ধমান খরচ এয়ারলাইনগুলোকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সার্টিফিকেশনের অর্থ হলো, প্রকৌশল পর্যালোচনা ও ফ্লাইট টেস্টিংয়ের পর এফএএ নির্ধারণ করেছে যে ম্যাক্স ১০-এর ডিজাইন নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করে। তবে বোয়িংকে এখনো দেখাতে হবে যে এটি অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে উড়োজাহাজ তৈরি করতে পারে, এবং যাত্রী পরিবহনের আগে প্রতিটি উড়োজাহাজকে পৃথকভাবে ছাড়পত্র নিতে হবে।
এই সার্টিফিকেশনের মধ্য দিয়ে চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের পুরো লাইনআপ সম্পূর্ণ হলো। আগস্টে এফএএ ম্যাক্স ৭-কে এয়ারলাইন পরিচালনার জন্য ছাড়পত্র দিয়েছিল। একই বছরে ম্যাক্স ৭ ও ম্যাক্স ১০—দুটোরই সার্টিফিকেশনকে কোম্পানির সহনশীলতার লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেন পোপ।
প্রাণঘাতী ম্যাক্স ৮ দুর্ঘটনার পর এফএএ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ সার্টিফিকেশনের পুরো পদ্ধতি ঢেলে সাজিয়েছিল। তবে গত ১৮ মাসে সংস্থাটি ধীরে ধীরে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে এবং বোয়িং কতগুলো উড়োজাহাজ উৎপাদন করতে পারবে সেই সীমা বাড়িয়েছে। জুলাই মাসে এফএএ জানায়, বোয়িং আবারও উৎপাদন শেষে নিজেদের ৭৩৭ ম্যাক্স ও ৭৮৭ উড়োজাহাজের এয়ারওয়ার্থিনেস সার্টিফিকেট নিজেই ইস্যু করতে পারবে, ফলে সমাপ্ত উড়োজাহাজ উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত কি না তা নির্ধারণের দায়িত্বের কিছুটা ফিরে পেল কোম্পানিটি।






