আইপিওর আগেই ছয় মাসে ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি লোকসান অ্যানথ্রপিকের, হিসাবের খাতেই বড় অংশ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির মধ্যেই বড় অঙ্কের লোকসানের হিসাব প্রকাশ্যে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শীর্ষ স্টার্টআপ অ্যানথ্রপিকের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮০ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) জন্য তৈরি খসড়া প্রসপেক্টাস পর্যালোচনা করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নথি অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কাগজে-কলমে লোকসানের অঙ্ক বেড়েছে কয়েক গুণ।
তবে এই লোকসানের সবচেয়ে বড় অংশটি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় নয়। চলতি বছরের প্রথমার্ধের লোকসানের মধ্যে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারই কেবল একটি হিসাবরক্ষণ চার্জ। ভবিষ্যতে অ্যানথ্রপিকের শেয়ারে রূপান্তর হতে পারে—এমন বন্ডগুলোর আনুমানিক বাজারদর ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই অঙ্ক নথিভুক্ত করতে হয়েছে, যা সরাসরি কোনো নগদ ব্যয় নয়।
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। তবে আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর কিছু বিনিয়োগকারী এখন অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্যায়ন কমিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে বিবেচনা করছেন বলে নথি পর্যালোচনায় জানা গেছে।
এই হিসাব প্রকাশ পেল এমন এক সময়ে, যখন এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারে চিপ ও ডেটা সেন্টারের পেছনে ঢালা বিপুল অর্থ থেকে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের গভীর পর্যালোচনা চলছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্লাউড সেবা, কম্পিউটিং ও অবকাঠামো খাতে আগামী এক দশকে অন্তত ৫১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অ্যানথ্রপিক।
ব্যয়ের চাপের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় অবকাঠামো খাতের সংখ্যায়। কেবল চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই কম্পিউটিং ক্ষমতা ও অবকাঠামো খাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গত ১৪ অক্টোবর সম্ভাব্য আইপিও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক সভায় অ্যানথ্রপিক জানায়, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের রাজস্ব আয় আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে আয় বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে সবার মনোভাব এক নয়। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী হতাশা প্রকাশ করেছেন; কারণ প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
এই ধরনের হিসাবরক্ষণজনিত লোকসান অ্যানথ্রপিকের জন্য নতুন নয়। এর আগে ২০২৫ সালেও একই প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ৪২ বিলিয়ন ডলার নিট লোকসান গুনেছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছিল। সেই হিসাব বাদ দিলে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আয়ের বিপরীতে কোম্পানিটির প্রকৃত পরিচালন লোকসান ছিল প্রায় ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
আয়ের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটির একটি শক্তির জায়গা হয়ে উঠেছে কোডিং সহায়ক সেবা ‘ক্লড কোড’। সফটওয়্যার ও অ্যাপ নির্মাতাদের কাছে এই সেবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা অ্যানথ্রপিকের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছর প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই পুঁজিবাজারে আসার আগে অ্যানথ্রপিকের আইপিও কীভাবে গৃহীত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে সামগ্রিক এআই বাজারের তাৎক্ষণিক ভবিষ্যৎ। ফলে এই তালিকাভুক্তি শুধু একটি কোম্পানির নয়, পুরো খাতের জন্যই পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অ্যানথ্রপিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এখন নজর থাকবে নভেম্বরের সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির দিকে—বিনিয়োগকারীরা এই বিশাল কাগুজে লোকসানের হিসাব পেরিয়ে কোম্পানিটির আয় ও প্রবৃদ্ধির গল্পে কতটা আস্থা রাখেন, সেটাই হবে আসল বিচার।





