সাইলোসাইবিন কি প্রদাহের বিরুদ্ধেও কাজ করে? মানবদেহে গবেষণায় আশার সংকেত
সাইলোসাইবিন ও এলএসডির মতো ক্লাসিক সাইকেডেলিক নিয়ে গবেষণা এত দিন মূলত মস্তিষ্ককেন্দ্রিক ছিল—চেতনার গভীর পরিবর্তন আর মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়েই ছিল বেশির ভাগ আলোচনা। কিন্তু এখন গবেষকেরা দেখছেন, এই যৌগগুলো শরীরের অন্যান্য অংশেও পরিবর্তন আনতে পারে—বিশেষ করে প্রদাহ ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার বিরুদ্ধে।
বুধবার চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জেএএমএ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় মানুষের ওপর পাওয়া প্রথম দিকের কিছু প্রমাণ মিলেছে, যেখানে দেখা গেছে সাইলোসাইবিন প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে। গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর (ইউসিএসএফ) একটি গবেষক দল।
গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন পারকিনসন রোগে আক্রান্ত ১২ জন। এটি ছিল একটি পাইলট গবেষণা—স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্তদের সাইলোসাইবিন দেওয়া কতটা নিরাপদ ও সম্ভব, তা যাচাই করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। সাধারণত নিরাপত্তার কথা ভেবে এ ধরনের রোগীদের সাইকেডেলিক গবেষণা থেকে বাইরে রাখা হয়।
গবেষকেরা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের শরীরে প্রদাহের সঙ্গে জড়িত পাঁচটি সংকেতবাহী অণুর মাত্রা মেপেছেন—সাইলোসাইবিনের দুটি সেশনের আগে ও পরে।
ফলাফলে দেখা গেছে, চিকিৎসার পর অংশগ্রহণকারীদের প্রদাহের মাত্রা শুরুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আর সেই পরিবর্তন শেষ ডোজের এক মাস পরও টিকে ছিল।
গবেষকেরা কোষের শক্তি উৎপাদনকারী অংশ মাইটোকন্ড্রিয়ার চাপের একটি রক্ত-চিহ্নও পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানেও সাইলোসাইবিন দেওয়ার পরপরই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে, যদিও দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণের সময় সেই উন্নতি আর ধরা পড়েনি।
গবেষণার অন্যতম নেতা ইউসিএসএফের মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ডা. এলেন ব্র্যাডলি বলেছেন, এটি আমাদের অনুসন্ধানের জন্য একটি প্রাথমিক জৈবিক সংকেত দিচ্ছে। আগের মূল গবেষণার ফল গত বছর প্রকাশিত হয়েছিল; সেখানে নিরাপত্তার দিক থেকে সত্যিই আশাব্যঞ্জক চিত্র পাওয়া গিয়েছিল এবং রোগীদের উপসর্গও কিছুটা ভালো হতে দেখা গিয়েছিল বলে জানান তিনি।
তবে গবেষকেরা নিজেরাই সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্ট করেছেন। গবেষণায় কোনো নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না, আর অংশগ্রহণকারীরা জানতেন যে তারা ওষুধটি পাচ্ছেন। ফলে রক্তে পাওয়া এই পরিবর্তনগুলো চূড়ান্তভাবে বলার আগে আরও গবেষণায় যাচাই করা দরকার—বলেছেন গবেষণাপত্রের সহলেখক ও ইউসিএসএফের অধ্যাপক আইফে ও'ডোনোভান।
তবু ও'ডোনোভানের মতে, এখানে পাওয়া চিহ্নগুলো বস্তুনিষ্ঠ এবং সময়ের সঙ্গে সেগুলোর পরিবর্তন তাদের এই ধারার গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।
পারকিনসন রোগের বৈশিষ্ট্যই হলো অনিয়ন্ত্রিত প্রদাহ ও মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মহীনতা। ব্র্যাডলির মতে, প্রদাহ ও কোষীয় চাপের এই উন্নতিই হয়তো ব্যাখ্যা করে কেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের অবস্থার উন্নতি দেখা গিয়েছিল।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ডি. পার্কার কেলি বলেন, এই ফলাফল আরও বড় সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে—সাইকেডেলিক হয়তো শুধু পারকিনসন নয়, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো স্নায়ু-মানসিক রোগ, এমনকি হৃদ্যন্ত্র-বিপাকীয় ও প্রদাহজনিত রোগের ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে। তার ভাষায়, এটি এই ক্ষেত্রে আরও অনেক গবেষণার সম্ভাব্য সূচনাবিন্দু হতে পারে।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, এমন বিশেষজ্ঞরাও ফলাফলটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এলএসইউ হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের অধ্যাপক চার্লস নিকোলস প্রায় পনেরো বছর আগে গবেষণাগারে আবিষ্কার করেছিলেন যে কোনো কোনো সাইকেডেলিক শক্তিশালী প্রদাহবিরোধী প্রভাব ফেলতে পারে। তার দল প্রাণীর ওপর হাঁপানি, বাত ও হৃদ্রোগের মডেলে অসংখ্য পরীক্ষা চালিয়েছে।
নিকোলসের মতে, আগের গবেষণাগুলোতে সাধারণত সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর সাইলোসাইবিনের প্রভাব দেখা হয়েছে—আসল রোগে আক্রান্তদের ওপর নয়। সেই দিক থেকে এই গবেষণা আলাদা, আর তাই এটি সত্যিই রোমাঞ্চকর।
সব মিলিয়ে গবেষকদের বার্তা সতর্ক কিন্তু আশাবাদী: মাত্র ১২ জনের ছোট এই গবেষণা কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তবে প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় সাইকেডেলিকের সম্ভাবনা নিয়ে বড় ও নিয়ন্ত্রিত গবেষণার পথ খুলে দিল এই ফলাফল—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





