কোমরে গামছায় বাঁধা আড়াই বছরের সানি, অটোরিকশা চালিয়ে জীবনযুদ্ধে পাবনার রবিউল
দুই হাতে অটোরিকশার হাতল, আর কোমরের সঙ্গে গামছা দিয়ে বাঁধা ছোট্ট একটি শিশু—পাবনা শহরের অলিগলিতে এভাবেই প্রতিদিন ছুটে চলেন অটোচালক রবিউল ইসলাম। শিশুটি কখনো ফিডার থেকে দুধ খায়, কখনো অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে চারপাশে। এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হন অনেক পথচারীই।
রবিউল পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা। গামছায় বাঁধা শিশুটি তাঁর আড়াই বছরের সন্তান আলফে সানি। অন্য শিশুদের মতো মায়ের আদর পাচ্ছে না সে; দুই বছর বয়স থেকেই মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এই শিশুর এখন বাবাই একমাত্র আশ্রয়।
রবিউল জানান, পারিবারিকভাবে ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি তাঁর বিয়ে হয়। ২০২৪ সালের ১ মে জন্ম নেয় আলফে সানি। কিন্তু পারিবারিক বিরোধে চলতি বছরের ৫ মে সানিকে রেখে চলে যান তার মা। সেদিন থেকে সন্তানকে একা আগলে রেখেছেন রবিউল।
রবিউলের ভাষ্য, দারিদ্র্যের কারণেই প্রায় ছয় মাস আগে স্ত্রী বাবার বাড়ি চলে গেছেন। কয়েক দফা চেষ্টা করেও তাঁকে ফেরাতে পারেননি তিনি। নিজের মা-বাবাও বেঁচে নেই, তাই শিশুসন্তানকে একা রেখে কাজে বের হওয়ার কোনো উপায় তাঁর নেই।
একসময় একটি সরিষার তেলের মিলে কাজ করতেন রবিউল। মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আধা কাঠা জমি বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে কেনেন অটোরিকশাটি।
অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তাঁর আয় হতো ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, তা দিয়ে মোটামুটি চলছিল সংসার। কিন্তু গত ৫ মে স্ত্রী চলে যাওয়ার পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঠিকমতো অটোরিকশাও চালাতে পারেন না তিনি, আবার সন্তানকে রেখে যাওয়ার জায়গাও নেই।
সোমবার দুপুরে রবিউলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অটোরিকশা চালিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। ছেলেকে খাওয়াচ্ছিলেন; তারপর বাবা-ছেলে একসঙ্গে গোসল করেন। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের মতোই সন্তানের যত্ন নেন রবিউল।
নিজের বসতবাড়ি বা জমি বলতে কিছুই নেই রবিউলের। খালাতো ভাইয়ের ছেলের ভাঙাচোরা দুটি টিনের ঘরের একটিতে শিশুসন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। ভাঙা ছাপড়া টিনের ঘরেই বাবা-ছেলের সংসার।
রবিউল বলেন, ভীষণ সংকটের মুখোমুখি তিনি, কিন্তু থেমে থাকার সুযোগ নেই। এই লড়াইয়ে তাঁকে জিততেই হবে—তাই সন্তানকে কোমরের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা নিয়ে পথে নামেন প্রতিদিন। শিশুসন্তানকে নিয়ে এই জীবনযুদ্ধ কখন থামবে, তা তিনি নিজেও জানেন না।
প্রতিবেশী রমজান আলী, শহিদুল ইসলাম ও বিজন শেখ বলেন, ছোটবেলা থেকেই রবিউল অসহায়। বিয়ের পর অটোরিকশা চালিয়ে মোটামুটি চলছিল তাঁর, কিন্তু স্ত্রী চলে যাওয়ার পর খুব কষ্টে দিন কাটছে। সরকার যেন রবিউল ও তাঁর ছেলের পাশে দাঁড়ায় এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে—এমন দাবি জানান তাঁরা।
সুখবর হলো, বিষয়টি পৌঁছেছে প্রশাসনের কানেও। পাবনার জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রবিউল ও তাঁর শিশুসন্তানের বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সরকারিভাবে আমরা করব। তাঁর নিজস্ব জায়গা থাকলে সেখানে আমরা একটি ঘর করে দেব। আর রবিউল ও তাঁর স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মধ্যে কী সমস্যা আছে, জেনে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
জেলা প্রশাসকের এই আশ্বাস এখন রবিউলের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনে, সেদিকে তাকিয়ে প্রতিবেশীরা। আপাতত প্রতিদিনের মতোই কোমরে সানিকে বেঁধে পাবনার অলিগলিতে অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন তিনি—এক হাতে সংসারের হাল, আরেক হাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ।




