ট্রাকে আটকে ৫৩ অভিবাসীর মৃত্যু: গুয়াতেমালার মানব পাচারকারীকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে
যুক্তরাষ্ট্রে মানব পাচারের এক মর্মান্তিক ঘটনায় গুয়াতেমালার এক নাগরিককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন মার্কিন আদালত। ২০২২ সালে একটি ট্রাক্টর-ট্রেলারের ভেতরে প্রচণ্ড গরমে আটকে পড়ে ৫৩ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছিল — যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে এমন ঘটনাগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম প্রাণঘাতী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার মার্কিন জেলা বিচারক অরল্যান্ডো গার্সিয়া ৩৯ বছর বয়সী রিগোবের্তো রোমান মিরান্দা-ওরোজকোকে এই সাজা দেন। ২০২৫ সালের মার্চে গুয়াতেমালা থেকে প্রত্যর্পণের এক বছরেরও বেশি সময় পর এই রায় এলো।
মিরান্দা-ওরোজকোকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় ২০২৪ সালের আগস্টে গুয়াতেমালায় — মানব পাচার চক্রটি ভেঙে দিতে আন্তঃসীমান্ত অভিযানের অংশ হিসেবে।
মামলার সূত্রপাত ২০২২ সালের ২৭ জুনের সেই ঘটনা থেকে। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের সান আন্তোনিওর দক্ষিণ উপকণ্ঠে এক নির্জন এলাকায় পরিত্যক্ত একটি ট্রাকের ভেতরে আটকে থাকা বহু মানুষকে উদ্ধারকর্মীরা আবিষ্কার করেন।
মোট ৬৪ জন অভিবাসী গুয়াতেমালা থেকে শুরু করে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের দীর্ঘ যাত্রায় ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, টেক্সাসের লারেডো থেকে সান আন্তোনিও পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার পথে ট্রাকটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; ট্রাকটি পাওয়া যাওয়ার সময় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঘটনাস্থলেই ৪৮ জনের মৃত্যু ঘোষণা করা হয় এবং তাপজনিত অসুস্থতা ও পানিশূন্যতার চিকিৎসা চলাকালে আরও পাঁচজন মারা যান। নিহতদের মধ্যে ছিল ছয়টি শিশু ও একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী; মৃতদের ২১ জন ছিলেন গুয়াতেমালার নাগরিক।
মিরান্দা-ওরোজকো স্বীকার করেছেন, ট্রাকে মারা যাওয়া দুই অভিবাসী এবং গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে যাওয়া আরেকজনের যাত্রা ও থাকার ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন।
জুলাইয়ে তিনি দোষ স্বীকার করেন — মৃত্যুর কারণ হওয়া অভিবাসী আনার ষড়যন্ত্র এবং মৃত্যু ও গুরুতর আঘাতের কারণ হওয়া অবৈধ প্রবেশে সহায়তার অভিযোগে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এই ট্র্যাজেডির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়াতেমালায় প্রায় ২০ জন সাজা পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই অভিযানের নেতা হিসেবে চিহ্নিত ফেলিপে ওরদুনা-তোরেসকে ২০২৫ সালের জুনে সান আন্তোনিওর ফেডারেল আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
তাঁর প্রধান সহকারী হিসেবে বর্ণিত আরমান্দো গনজালেস-ওর্তেগা পেয়েছেন ৮৩ বছরের সাজা। ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে মামলাসহ আরও কিছু প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে।
অভিযোগপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিত্যক্ত ট্রাক থেকে বেরোনোর মরিয়া চেষ্টার চিহ্ন তদন্তকারীরা পেয়েছিলেন — কেউ কেউ পোশাক খুলে ফেলেছিলেন, ট্রেলারের ভেতরের দেয়ালে আঁচড়ের দাগ ছিল, যা থেকে বোঝা যায় অনেকে দেয়াল আঁকড়ে বেরোনোর বৃথা চেষ্টা করেছিলেন। যাত্রীরা সীমান্ত পার হতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দিয়েছিলেন বলেও জানানো হয়।
মার্কিন অ্যাটর্নি জাস্টিন সিমন্স সাজা ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টায় তাঁরা ভয়াবহ কষ্ট পেয়েছেন, তা স্পষ্ট ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মানব পাচার বন্ধের যুক্তিকে অভিবাসন কঠোরতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরে আসছে — এই মামলাটি সেই বিতর্কের মধ্যেই পাচারের ভয়াবহ মানবিক মূল্যের কথা আবার সামনে আনল।






