মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কানাডার বিরুদ্ধে 'হস্তক্ষেপের' অভিযোগ মার্কিন দূতাবাসের, কার্নির পাল্টা জবাব
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কানাডার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে অটোয়ায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। দূতাবাসের দাবি, কানাডার নেতারা 'সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ' নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিচ্ছেন, অথচ দেশটির মন্ত্রী ও প্রদেশ প্রধানরা 'সরকারি নথি ও প্রকাশ্য উপস্থিতিতে আমেরিকান রাজনীতিকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা খোলাখুলি বর্ণনা করছেন'। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিসহ কানাডার নেতারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই মধ্যবর্তী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ কোন রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ করবে, যার বড় প্রভাব পড়তে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি সময়ের ওপর। সেই নির্বাচনের আগেই প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করল এই অভিযোগ। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে উত্তর আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক এমনিতেই কঠিন হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত মার্কিন দূতাবাসের ফ্যাক্ট শিটে অভিযোগ করা হয়েছে, কানাডা সরকার 'মার্কিন নির্বাচনে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছে, এমনকি যখন দেশটির মন্ত্রী ও প্রদেশ প্রধানরা সরকারি নথি ও প্রকাশ্য উপস্থিতিতে আমেরিকান রাজনীতিকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা খোলাখুলি বর্ণনা করছেন'। ফ্যাক্ট শিটে উদাহরণ হিসেবে মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে বৈঠক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্কের আহ্বানের মতো মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিতলে শুল্ক নিয়ে কী আশা করা যায়, এমন প্রশ্নে শিল্পমন্ত্রী মেলানি জলি জবাব দিয়েছিলেন, 'ঠিক এই কারণেই আমি এত গভর্নর ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করছি।' দূতাবাসের দাবি, অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিয়েছিলেন বর্তমান প্রশাসনের সমর্থক ভিত্তি হিসেবে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ রাজ্যগুলো থেকে আমদানির ওপর অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক বিবেচনা করতে।
বুধবার এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কার্নি উল্লেখ করেন, কানাডার বিরুদ্ধে বাণিজ্য পদক্ষেপ প্রথম শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্রই। তিনি বলেন, 'কানাডার চাকরি রক্ষা করতে, কানাডার কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করতে এবং আমাদের অর্থনীতি গড়ে তুলতে আমরা সেগুলোর জবাব দিয়েছি।' তাঁর সরকারের এই জবাব 'কানাডার শ্রমিক, কানাডার পরিবার ও এই অর্থনীতির ভবিষ্যতের স্বার্থে' দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কার্নি যখন এসব কথা বলেন, তখন তিনি মার্কিন শুল্কের জবাবে প্রায় ৯০০ কোটি কানাডীয় ডলার (৬২০ কোটি মার্কিন ডলার) সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করছিলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জলি ও ফোর্ড, দুজনই। অর্থাৎ দূতাবাস যাঁদের মন্তব্যকে অভিযোগের ভিত্তি করেছে, তাঁদের নিয়েই পাশে দাঁড়িয়ে অভিযোগের জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী।
ফোর্ড বলেন, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপে তাঁর 'একেবারেই কোনো আগ্রহ নেই'। তিনি বলেন, 'আমি বলব আমেরিকান জনগণ কী চায়। তারা নিশ্চয়তা চায়, তারা স্থিতিশীলতা চায়', আর তিনি মনোযোগ দেবেন অন্টারিও ও কানাডায়। 'মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণই নেবে', যোগ করেন তিনি।
গত সপ্তাহে মন্ত্রী জলি কানাডার হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, কানাডীয়রা 'কানাডায় আমাদের সঙ্গেও এমনটা করা কখনো মেনে নেয় না'। তিনি বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সফরগুলো ছিল আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে 'বিনিয়োগ আকর্ষণের' জন্য, যা তিনি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
ওয়াশিংটন ও অটোয়া কয়েক মাস ধরে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে তর্কে জড়িয়ে আছে। একসময় দুই দেশের সীমান্তে বাণিজ্য অবাধে চলত; কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের প্রভাব নিয়ে এখন সেই সম্পর্কেই টান পড়েছে। হস্তক্ষেপের এই অভিযোগ সেই টানাপোড়েনের নতুন অধ্যায়।
এর আগে এই মাসের শুরুর দিকে কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েকস্ট্রা সতর্ক করেছিলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা নির্বাচনী হস্তক্ষেপের লক্ষণের জন্য কানাডার রাজনীতিকদের 'ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রাখছেন'। এই সপ্তাহে আলবার্টা প্রদেশের বিচ্ছিন্নতা গণভোট নিয়ে অনুচিত মন্তব্য করার অভিযোগও উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
হোয়েকস্ট্রাকে 'কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করার' অভিযোগে তাঁর পদ থেকে সরানোর দাবিতে একটি পিটিশনে ইতিমধ্যে দুই লাখ ৮০ হাজারের বেশি সই পড়েছে। ফলে দূতাবাসের এই ফ্যাক্ট শিট কূটনৈতিক অঙ্গনে আরও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে শুল্কযুদ্ধ ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ততই তীব্র হতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, সেই লড়াইয়ের ছায়া এখন দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপরও পড়ছে, আর তার মীমাংসা কবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।





