দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ১, আহত ৮: কূটনীতিকদের সপরিবারে সৌদি ছাড়ার নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের
সৌদি আরবের দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত একজন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গভীর অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন। শুধু সৌদি আরবই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বেশ কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকেও পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। চারজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের মার্কিন মিশনগুলোও পরিবারের সদস্যদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেবে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরবের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের মুখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল ‘সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি নন এমন মার্কিন সরকারি কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের’ দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরবের বাইরের অন্যান্য মিশনের পরিবর্তনের বিষয়ে অবশ্য পিগট কিছু বলেননি।
এই নির্দেশের পেছনে সরাসরি কারণ হিসেবে কাজ করেছে সাম্প্রতিক দুটি প্রাণঘাতী হামলা। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন। এর আগে দিনের বেলায় সৌদি আরামকোর শাইবাহ তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনায় হামলার চেষ্টাকারী একটি ড্রোন সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করার পর ২ জন নিহত হন বলে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
পিগট বলেন, ‘ইরান-সমর্থিত হুতিরা ক্রমবর্ধমানভাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সংঘাত বাড়িয়ে চলেছে। এর মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা অন্যতম, যার ফলে বেসামরিক মানুষ হতাহত হচ্ছে এবং ভ্রমণে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।’ বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনাই ওয়াশিংটনের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে বলে তার বক্তব্যে স্পষ্ট।
ইয়েমেনে লড়াই তীব্র হওয়ার পর কর্মী সরিয়ে নেওয়ার এই সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি এল, যা মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ থেকে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে নতুন আরেকটি রণক্ষেত্র খুলে দিয়েছে। এই ব্যাপক সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পেছনের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর তেহরান হামলা চালায়। তখন অনেক কূটনীতিককে সরিয়ে নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন কিছু কূটনৈতিক কর্মীকে আবার এই অঞ্চলে ফিরিয়ে এনেছিল। এবারের নির্দেশ সেই ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে আবার উল্টে দিল।
সাম্প্রতিক হামলার ধারাবাহিকতাও উদ্বেগজনক। সম্প্রতি রিয়াদের বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলার পর, ইয়েমেনের হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে আরও হামলা হতে পারে বলে বুধবার রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। চলতি মার্চ মাসের শুরুর দিকে ইরান পুরো অঞ্চলে হামলা চালানো শুরু করলে রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস এবং সেখানে অবস্থিত সিআইএ স্টেশন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল।
দাম্মাম সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশটির অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর। বেসামরিক যাত্রীদের ব্যবহার করা এমন একটি স্থাপনায় হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
কূটনীতিক ও তাদের পরিবার সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণত তখনই নেওয়া হয়, যখন আয়োজক দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় বলে মনে করা হয়। এবার সৌদি আরবের পাশাপাশি অন্যান্য উপসাগরীয় মিশনেও একই ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন পুরো অঞ্চলজুড়েই ঝুঁকি বাড়তে দেখছে।
এখন নজর থাকবে হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সৌদি আরবের জবাবের দিকে। হামলা আরও বাড়লে শুধু কূটনৈতিক উপস্থিতিই নয়, জ্বালানি সরবরাহ, বিমান চলাচল ও উপসাগরীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।





