…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
জাতীয়

‘বিটমানি’ দিলেই মহাসড়কে চলতে পারে অটোরিকশা: বরিশাল-ঢাকা পথে নিষেধাজ্ঞা কাগজে, চলাচল বাস্তবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট যানবাহন। প্রশ্ন উঠছে বারবার — নিষিদ্ধ হয়েও কীভাবে চলছে এসব যান?

চালকদের ভাষ্য, পুলিশি নজরদারির দুর্বলতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের তদবির আর শ্রমিক সংগঠনের নামে ‘বিটমানি’ দিয়েই মহাসড়কে চলার সুযোগ মিলছে। এতে বাস-ট্রাকসহ বড় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে — এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলছেন চালকেরা নিজেরাও।

‘বিটমানি’ বলতে বোঝানো হচ্ছে, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ছোট যানবাহন চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে শ্রমিক সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতাদের নিয়মিত চাঁদা দেওয়া। কোনো গাড়ি পুলিশ আটক করলে শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে ছাড়ানোর ব্যবস্থাও করেন তাঁরা — এজন্য আবার বাড়তি টাকাও দিতে হয় চালকদের। ফলে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল টাকার ব্যবস্থা।

প্রশাসনের অভিযান ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলা এসব যানবাহনের অনেক চালকেরই প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নেই। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা; প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হয়ে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে অনেককে, কেউ কেউ বরণ করছেন পঙ্গুত্ব।

বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উজিরপুরের শিকারপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ একসময় ভাসমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর আর ব্যবসায় ফিরতে পারেননি তিনি। মহাসড়কের পাশে নিজের একটি দোকানঘর গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শুরু করেন তিনি।

প্রতিদিন ৩০০ টাকা ভাড়ায় রিকশা নিয়ে সড়কে নামেন ইউসুফ। তাঁর ভাষ্য, মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ। ছোট যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও একটি শ্রমিক সংগঠনকে ‘বিটমানি’ দিয়ে অনেক চালক মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ওই টাকা না দেওয়ায় প্রথমে প্রায়ই তাঁর গাড়ি আটক করা হতো।

প্রথমে উজিরপুরের বিভিন্ন স্থানীয় সড়কে রিকশা চালানোর চেষ্টা করেন ইউসুফ। কিন্তু সেখানে যাত্রী কম থাকায় গাড়ির ভাড়া তুলতেই হিমশিম খেতে হতো, সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আয় বাড়ানোর আশায় শ্রমিক সংগঠনকে বিটমানি দিয়ে মহাসড়কে গাড়ি চালানো শুরু করেন তিনি। এজন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ১০ টাকা করে বিটমানি দিতে হয়; আবার নির্দিষ্ট এলাকা অতিক্রম করলে অন্য স্থানে আরও ১০ টাকা দিতে হয়। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দিনভর এসব যানবাহন থেকে ওসব ব্যক্তি বিটমানি তোলেন।

ইউসুফ বলেন, ‘ছোট গাড়ি চালানো সহজ পেশা। আর এই পেশায় নগদ টাকা পাওয়ায় আয় করাও সহজ হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া এবং মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজ করে চলাচল করা।’ তিনি বলেন, ‘সবকিছুই ম্যানেজ করে চলাচল করা যায়। তবে মাঝেমধ্যে মহাসড়কের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা বিটমানি নিলেও গাড়ি আটক করেন। গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে হয় চালকদের। মালিকের সাফ কথা, গাড়ি যেভাবে নিয়েছি, সেভাবেই ফেরত দিতে হবে। এমনকি কোনো মামলা হলে সেটিও চালককে সামলাতে হয়। আর গাড়ি বাজেয়াপ্ত হলে নতুন গাড়ির দাম দিতে হবে।’ এসব শর্ত মেনেই গাড়ি ভাড়া নিতে বাধ্য হন চালকেরা।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান আবু সাঈদ। তাঁর ভাষ্য, মহাসড়কে বড় যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ; তারপরও পরিবারের কথা ভেবে তাঁরা এ পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। সাঈদ জানান, তিনি যখন বাড়িতে থাকেন, তখন তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছেলেও অটোরিকশা চালিয়ে যাত্রী বহন করে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে — এমন আশঙ্কা থাকার পরও আয়ের তাগিদে তাঁরা ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে কাজকর্ম কম থাকলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার কদর বাড়ে, তখন সহজে আয় করার আশায় অনেক শ্রমিক এসব যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে নামেন।

বরিশাল নগরীর মধ্য দিয়ে প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশে বিস্তৃত বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক। এ ছাড়া বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, বানারীপাড়া ও গৌরনদী উপজেলার ওপর দিয়ে সড়কটি ভাঙ্গা হয়ে পদ্মা সেতুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে বরিশাল নগরী থেকে শুরু করে এসব উপজেলার নিম্নআয়ের অনেক মানুষ ছোট যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করছেন। যাত্রীবাহী বাস ও বড় ট্রাকের সঙ্গে ছোট যানবাহনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে এবং এ ধরনের দুর্ঘটনার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে।

বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। এরপরও বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে হাজার হাজার ছোট যানবাহন চলাচল করায় যাত্রীবাহী বাসসহ বড় যানবাহনের চালকদের মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করা হলেও সরকার ও প্রশাসন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ছোট যানবাহনের চলাচল বন্ধ না হওয়ায় দুর্ঘটনাও বাড়ছে। কিন্তু দেখে কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’ তিনি বলেন, মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচলের সুযোগ দিতে হলে তাদের জন্য পৃথক লেন তৈরি করতে হবে, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তা ছাড়া ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়ক সরু হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্ত করার দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, সরকার এখনই ছোট যানবাহন তৈরির কারখানাগুলো বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এগুলো দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে; নগরী থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কারখানা গড়ে তুলে ছোট যানবাহন তৈরি করা হচ্ছে, এসব কারখানার অনেকগুলোর বৈধতা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের দুজন সদস্য বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদদে এসব যানবাহন চলাচল করে। মহাসড়কে গাড়ি আটক করা হলে সংশ্লিষ্ট নেতারা তদবির শুরু করেন; মাঝেমধ্যে তাঁদের দুর্ব্যবহারেরও শিকার হতে হয় পুলিশ সদস্যদের। এমনকি ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় — এজন্য বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানান তাঁরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই কথা বলেছেন হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আগে আওয়ামী লীগের নেতারা এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতো, চাঁদা নিয়ে মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ করে দিতো। আটক করলে তদবির করে ছাড়িয়ে নিতেন। এখন বর্তমান সরকারের লোকজন ওই তদবির করছেন। তবে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে এবং এসব যানবাহনের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই মহাসড়ক থেকে অবৈধ ছোট যানবাহন সরানো সম্ভব। আবার যানবাহন আটক না করলে আমরা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছি না বলে অভিযোগ তোলা হয়; আর আটক করলেই ঘুষ গ্রহণ ও বিটমানি সংক্রান্ত নানা অভিযোগ আনা হয়। আসলে বিটমানি কিংবা চাঁদা — এসবের সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সরকারদলীয় নেতারা অনুরোধ করলে ছেড়ে দিতে হয় গাড়ি, তখন অভিযোগ তোলা হয় আমরা টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি।’

বরিশাল বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, ‘তিন চাকার যানবাহন তৈরির কারখানাগুলোতে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। মহাসড়কে এ ধরনের যানবাহন চলাচল ঠেকাতেও বিআরটিএ অভিযান পরিচালনা করে। এসব যানের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কঠোর অবস্থানে রয়েছি আমরা।’

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, ‘বরিশাল নগরীর মধ্য দিয়ে ১১ কিলোমিটার মহাসড়ক গেছে। সেখানে বড় যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবৈধ ছোট যানবাহন চলাচল করে। এগুলোর চলাচল বন্ধে প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ যানবাহন তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়েও সেগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। তবু থামানো যায় না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বরিশাল নগরীতে ৪০ হাজারের বেশি অবৈধ যানবাহন রয়েছে। এই থেকে ধারণা করা যায়, যেসব উপজেলার ওপর দিয়ে মহাসড়ক গেছে, সেখানেও অবৈধ ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যানবাহনের কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। আমরা চেষ্টা করছি এগুলো যাতে মহাসড়কে উঠতে না পারে। তবু গোপনে কিংবা আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সুযোগ পেলেই মহাসড়কে উঠে যায় এসব যান।’

সব পক্ষের বক্তব্যে একটি চিত্রই স্পষ্ট — নিষেধাজ্ঞা আছে, অভিযানও হয়, কিন্তু জীবিকার তাগিদ, বিটমানির সমান্তরাল ব্যবস্থা আর তদবিরের চাপে মহাসড়ক থেকে ছোট যান সরানো যাচ্ছে না। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল চলছেই, আর দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়ে যাচ্ছে প্রতিদিনের যাত্রায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

শ্রীনগরে ভোরের আগুনে পুড়ল সালমা বেগমের বসতঘর, দুই ইউনিটের চেষ্টায় রক্ষা পেল আশপাশের ঘর

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে ভোরে একটি টিনের বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে ঘর ও ঘরের ভেতরের আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনি…

জাতীয়

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে চাল-তেলে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা: লাভের টাকা যাচ্ছে কার পকেটে

চাল ও ভোজ্যতেল — প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার এই দুই অপরিহার্য পণ্যের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের প্রতিটি পরিবারের বাজেটে। অথচ বিশ্ববাজারে চাল …

জাতীয়

সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসচাপায় পথচারী নিহত, পালিয়েছে ঘাতক বাস, আরেকটি বাস আটক জনতার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি বাসের চাপায় অজ্ঞাতপরিচয় এক পথচারী নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩০ বছর বলে জানা গেছে।…