যুদ্ধের পর তেহরানে প্রকাশ্যেই উঠছে পরমাণু বোমা তৈরির দাবি, বিতর্কে বিভক্ত ইরান
ইরানের রাজনীতিতে একসময় যা ছিল চরম গোপনীয় ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বিষয়, আজ তা প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে দীর্ঘ আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তেহরানের নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের একাংশ এখন আর রাখঢাক না করে প্রকাশ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি তুলছেন।
অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্বকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। যুদ্ধ সেই পুরোনো ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি; খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব ও বহু সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় সামরিক তৎপরতা কমিয়ে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের স্পষ্ট কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।
ঠিক এই অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান ইতিমধ্যে অনেক চড়া মূল্য দিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।
রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। এই পক্ষ ট্রাম্পের পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন—উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালী আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব।
সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতের মতো সমালোচকদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এই উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। তাদের আশঙ্কা, বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই নতুন হামলার মুখে পড়তে পারে ইরান।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: যুদ্ধে যে ধ্বংসযজ্ঞ ইরান দেখেছে, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর উপায় কি পরমাণু অস্ত্র, নাকি তা আরও বড় ধ্বংসের দরজা খুলে দেবে? দুই পক্ষের কেউই এখনো অন্য পক্ষকে মানাতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই প্রকাশ্য বিতর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নিলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে।
আপাতত তেহরানের সিদ্ধান্ত কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু—যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। প্রকাশ্য এই বিতর্কই বলে দিচ্ছে, যুদ্ধ ইরানের রাজনীতিকে এমন এক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে পুরোনো পথে ফেরা আর সহজ নয়।





