দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৫০ জনের ভিড়ের পিটুনিতে বিদেশি নাগরিক নিহত, অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনার মধ্যে তদন্তে পুলিশ
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে প্রায় ৫০ জনের একটি ভিড়ের পিটুনিতে একজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। দেশটিতে এ বছর অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের ধারাবাহিকতার মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ত্রিশের শেষের দিকে বা চল্লিশের শুরুর দিকে। প্রথমে রাস্তার পাশে দুজন ব্যক্তি তার কাছে যান, এরপর একটি বড় দল তাকে আক্রমণ করে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘোষণা করা হয়।
পুলিশ এই হত্যার তদন্ত শুরু করেছে, তবে হত্যার উদ্দেশ্য এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। প্রাদেশিক পুলিশের মুখপাত্র রবার্ট নেটশিউন্ডা বলেছেন, ডারবানের এই হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে তারা অনুমান করতে পারেন না, এবং যাচাই করা তথ্য পেলে আরও জানানো হবে।
এই হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় এ বছর অভিবাসীদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিক্ষোভ হয়েছে, যার কয়েকটি সহিংস রূপ নিয়েছে। এই মাসের শুরুতেই ডারবান এবং জোহানেসবার্গের কাছে সোয়েটোতে দোকানপাট ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
সরকার বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ আচরণের আহ্বান জানিয়েছে, পাশাপাশি অভিবাসন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বছরের শুরুতে অভিযান শুরুর পর থেকে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিককে দেশ থেকে ফেরত পাঠানো বা প্রত্যাবাসন করা হয়েছে।
বিক্ষোভের পেছনে থাকা গোষ্ঠীগুলোর একটি, ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’, প্রথমে সব অনথিভুক্ত অভিবাসীকে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। সেই সময়সীমার আগে একাধিক বিক্ষোভ হয়, এবং অন্য আফ্রিকান দেশের মানুষের ওপর হামলার খবরও পাওয়া যায়।
এসব ঘটনার পর জিম্বাবুয়ে, নাইজেরিয়া ও ঘানাসহ কয়েকটি দেশ আরও সহিংসতার আশঙ্কায় তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নেয়। নাইজেরিয়া সেই মাসে তাদের দুই নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে।
ঘানাও তাদের এক নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে — বাশিরু ইসাক নামের তিন সন্তানের জনক ওই ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো বিক্ষোভের সময় কেপ টাউনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার মৃত্যু দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করে; দক্ষিণ আফ্রিকা তখন বলে, সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।
‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ আন্দোলনের নেতাদের একজন জাসিন্টা এনগোবেসে-জুমা নিজেকে বিদেশিবিদ্বেষী বলে মানতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এত বছর ধরে এই মানুষদের সঙ্গে বসবাস করতে পারছি, আর এখন যখন বলছি এটা অতিরিক্ত হয়ে গেছে, যথেষ্ট হয়েছে, তখন আমাদের বিদেশিবিদ্বেষী বলা হচ্ছে।’
দক্ষিণ আফ্রিকা প্রায় দুই দশক ধরে বিদেশিবিদ্বেষী হামলার সমস্যায় ভুগছে। ২০০৮ সালে বিদেশি নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হামলায় ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে ব্যাপক দারিদ্র্য, গভীর বৈষম্য এবং কর্মশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে প্রভাবিত করা বেকারত্বের প্রেক্ষাপট। অভিবাসীদের প্রায়ই চাকরি দখল, অপরাধে ভূমিকা এবং সরকারি সেবার ওপর চাপ তৈরির জন্য দোষারোপ করা হয়, যদিও গবেষকরা বলেন, এমন ঢালাও দাবির পক্ষে প্রমাণ মেলে না।
অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকা কাজ, নিরাপত্তা ও ভালো সুযোগের খোঁজে আসা অভিবাসীদের জন্য মহাদেশের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়েই রয়েছে। ডারবানের সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ কী উদ্দেশ্য খুঁজে পায়, এবং এই সহিংসতা থামাতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।





