সাভারে অস্ত্রোপচারে শিশুর মৃত্যুর পর ১০ লাখ টাকায় আপসের অভিযোগ, মা বলছেন টাকা নেননি
ঢাকার সাভারে অস্ত্রোপচারের সময় ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরিবারের ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিশুটির মা টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে সাভার পৌর এলাকার মুক্তির মোড়ে লন্ডনাস রেস্টুরেন্টে এই আপস-মীমাংসা হয় বলে সেখানে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, রেস্টুরেন্টের মালিক সাইফুল ইসলাম ও আবুল কালাম তাপসের উপস্থিতি ও মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়।
লন্ডনাস রেস্টুরেন্টের মালিক ও সাবেক ঢাকা জেলা ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম মীমাংসার কথা স্বীকার করলেও মুঠোফোনে টাকা লেনদেনের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অন্যদিকে নিহত শিশুর মা কনা আক্তার টাকা গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
এর আগে সাভার পৌর এলাকার আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচার চলাকালে আব্রাহাম (১১) নামের শিশুটির মৃত্যু হয়।
শিশুটির মা কনা আক্তারসহ পরিবারের অভিযোগ, টনসিল ও নাকের পলিপাস অস্ত্রোপচারের আগে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। তাঁদের দাবি, অদক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার এবং অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্বরত অন্য চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
পরিবারের আরও অভিযোগ, অপারেশন থিয়েটারেই শিশুটির মৃত্যু হলেও বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার অবস্থার অবনতির কথা বলে আইসিইউ লাগবে জানিয়ে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ স্বজনেরা দুপুরে আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভাঙচুর চালান। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য।
আপস-মীমাংসার সময় উপস্থিত স্থানীয় সাংবাদিক শাহনাজ পারভীনসহ একাধিক সাংবাদিক জানান, দিনভর দর-কষাকষির পর সন্ধ্যায় ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে আপসে রাজি হয় পরিবার। পরে রাতে রেস্টুরেন্টে মা কনা আক্তারসহ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে স্ট্যাম্পে লিখিত সমঝোতা হয় এবং হাসপাতালের পক্ষের লোকজন মায়ের হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দেন বলে তাঁরা জানান।
শাহনাজ পারভীন আরও জানান, সমঝোতার সময় ভুক্তভোগী পরিবারকে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি সাভার মডেল থানায় ২ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়েও মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা করতে দেখা যায়। স্থানীয় সাংবাদিক এস এ রশিদও ১০ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, আপসনামার স্ট্যাম্পে তিনি স্বাক্ষর করেছেন এবং সেখানে টাকার অঙ্ক উল্লেখ রয়েছে।
এস এ রশিদ বলেন, ‘শিশুটির গ্রামের বাড়ি আমাদের এলাকায়। এলাকাবাসী হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ১০ লাখ টাকা আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের পক্ষ থেকে নিহত শিশুটির মাকে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, পরে পরিবার সাভার মডেল থানায় বিনা ময়নাতদন্তে লাশ গ্রহণের আবেদন জানিয়ে লাশ বুঝে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে আবুল কালাম তাপস মীমাংসার বিষয়টি স্বীকার করলেও টাকা লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাভার মডেল থানার পুলিশের একটি সূত্র দাবি করেছে, পুরো সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন বলেন, পুলিশ পরিবারকে থানায় অভিযোগ দিতে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু তারা রাজি হয়নি; রাতে পরিবার অভিযোগ করবে না জানিয়ে লিখিত দিয়ে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিয়ে যায়। পুলিশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। হাসপাতালের মালিক ডা. মো. আব্বাস উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং ক্ষুদে বার্তারও সাড়া দেননি।





